ফিমেল – ৩৪

ফিমেল

অর্ঘ্য ঘোষ

( ৩৪ )

সময় আর কিছুতেই কাটতে চায় না সোহাগীর। বড়ো একা লাগে তার। তিনদিন হলো ছেলে-বৌমা বাড়ি ছাড়া। ফিরতে আরও চারদিন বাকি। ফাঁকা বাড়িতে কিছুতেই মন টেকে না। সময় কাটাতে খুলে বসে পোশাকের বাক্স। বর্ষার মরসুম আসছে। তিন-চারটে মাস আর বায়না হবে না। তাই পোশাকে ন্যাপথলিন দিয়ে ভরে রাখতে হবে। পোশাক ঘাঁটতে ঘাঁটতে কোথায় যেন হারিয়ে যায় সোহাগী। ওইসব পোশাকের সঙ্গে কত না স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। সেসব অবশ্য তার পড়ন্ত বেলার স্মৃতি। তখন তো সে মা-কাকীমায়ের পর্যায়ে পৌঁচ্ছে গিয়েছে। তারও আগে যখন শেফালিপিসির দলে কাজ করত তখন ওইসব পোশাক পড়ে স্টেজে নামার সময় নিজেকে রাজকন্যা মনে হত। মনে মনে ভাবত ঠিক একদিন কোন রাজকুমার এসে হাত ধরে নিয়ে যাবে তাকে। সেইসব কথা ভাবতে ভাবতেই চটকা ভাঙে বৃন্দার ডাকে। কিছুটা কটাক্ষ করেই সে বলে , দেখ গো দিদি কে এসেছে তোমার খোঁজে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতেই কপাল কুঁচকে যায় সোহাগীর। চোখের সামনে এ কাকে দেখছে! তাকে দেখতেই অন্য বাড়িগুলি থেকেও উঁকিঝুঁকি মারছে বেশ কিছু কৌতুহলী মুখ। তাদের চোখে মুখে কোন একটা নাটক দেখার তীব্র আগ্রহ। নিজেদের জীবনটাই যাদের নাটক , তারা কোথা থেকে যে নাটক দেখার এত উৎসাহ পায় কে জানে! নাটকটা আর জমতে দিলে হবে না। তাই বৃন্দাকে বলে , ঠিক আছে আমি ওর সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি। তুই যা। তারপর বৃন্দাকে বিদায় করে সদর দরজা বন্ধ করে দেয় সে। বৃন্দাদের কৌতুহল হওয়াটা যে স্বাভাবিক তা আগন্তুক মহিলাকে দেখে টের পায় সোহাগী। মহিলা যে অন্য আর কেউ নয় , যার সন্তান সে গর্ভে ধারণ করেছে সে যে তারই বৈধ স্ত্রী পদ্মাবতী। ওই মহিলাই যে একদিন তাকে বাড়ি থেকে ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছিল , সেই কথা আজ আর যাত্রাপাড়ার কারও অজানা নেই। তাই সবাই ধরেই নেয় আজ জমবে ভাল , সোহাগীও আজ নিজের বাড়িতে পেয়ে নিশ্চয় ছেড়ে কথা কইবে না। পদ্মাবতীকেও ঝেড়ে কাপড় পড়িয়ে ছাড়বে। সোহাগী ভেবে পায় না মহিলা হঠাৎ তার বাড়িতে কেন ? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই পদ্মাবতী বলে ওঠে , ভাই তোমাকে কিছু বলার মুখ আমার নেই। তোমার বাড়িতে আসার সাহসও আমার ছিল না। কিন্তু উনিই ঠেলেঠুলে পাঠালেন তোমার কাছে।
পদ্মাবতীর কথা শুনে অবাক হয়ে যায় সোহাগী। বিস্ময় ঝড়ে পড়ে তার গলায় — আমার কাছে ? কেন কি ব্যাপার ?
—- হ্যা ভাই উনি বললেন , যাই হোক না কেন সোহাগীর মনটা খুব ভালো। সবকিছু শুনলে কিছুতেই মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না।
আর ধৈর্য্য রাখতে পারে না সোহাগ। রাগে তার গা রি-রি করে ওঠে। রুক্ষ স্বরে বলে , অত ভনিতা না করে আসল ব্যাপারটা কি বলুন তো শুনি ? কিছুটা ইতস্তত করে পদ্মবতী , আসল কি জানো ভাই উনি খুব অসুস্থ। পয়সার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না। যে যেখানে ছিল সবাই হাত গুটিয়ে নিয়েছে। এখন তুমি যদি সাহায্য না করো তাহলে উনি বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন।
শুনে চাঁ করে মাথায় রক্ত চড়ে যায় সোহাগীর। ওই লোকটাই তাকে অন্তস্বত্ত্বা অবস্থায় বিপদের মুখে ফেলে তার যথাসর্বস্ব নিয়ে পালিয়েছিল। এই মেয়েটাই তার বিপদের কথা কানেই তোলেনি। ঝাঁটা পেটা করে বাড়ি থেকে তাড়ানোর কথা বলেছিল। সেকথা মনে পড়তেই সোহাগী কিছুটা বিদ্রুপের সঙ্গে বলে , আমিই বা হাত বাড়িয়ে দেব ভাবলেন কি করে আপনারা ?
জবাবে পদ্মাবতী আমতা আমতা করে বলে , আমরা তোমার সঙ্গে যা করেছি তার ক্ষমা নেই ঠিকই। কিন্তু আমরা যাই করি না কেন , তুমি তো একদিন লোকটাকে ভালোবেসেছিলে। সেই ভালোবাসার দোহাই দিয়েই বলছি তুমি ওকে বাঁচাও।
কথাগুলো শোনার পর কেমন যেন হয়ে যায় সোহাগী। মুখে কথা সরে না। চার অক্ষরের ওই শব্দটাই আবহমানকাল থেকে মেয়েদের মেরে রেখেছে। ওই শব্দটার মোহেই ভালোবাসার মানুষের পায়ে যথাসর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে নিস্ব হয়েছে তারা। সোহাগীই বা তার ব্যতিক্রম হবে কি করে ? ছেলে-বৌমাকে পুরী পাঠানোর পর বাক্সে ১০ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। বায়নাপত্র না হওয়া পর্যন্ত ওই টাকা দিয়েই দল এবং সংসারটা চালিয়ে নেবে ভেবে রেখেছিল। কিন্তু ভালোবাসার দোহাই শুনে সেই ভাবনা ভুলে যায়। টাকাটা বের করে এনে পদ্মাবতীর হাতে তুলে দেয় সে। টাকাটা পেয়ে অনেক ভালো ভালো কথা বলে বিদায় নেয় পদ্মাবতী। সোহাগীও যেন ভুলে যায় , ওই লোকটির কাছে থেকে সিঁথিয় সিন্দুরের মর্যাদা দুরের কথা , চুড়ান্ত অবমাননাকর সতীন পদবাচ্য হওয়ার অধিকারও পায় নি । পিতৃ পরিচয়ের অধিকার দুরের কথা , ওই লোকটির মৃত্যুর পর তার ছেলে পারলৌকিক কাজে অংশ নেওয়ারও অধিকার পাবে না। তবু সোহাগী সব ভুলে লোকটির আরোগ্য কামনা করে। হাজার হোক ওই লোকটির জন্যই তো সে মা ডাকটুকু শুনতে পাচ্ছে। ওই ডাকটাই যে নারী জীবনের সার্থকতা এনে দেয়। তাই যার জন্য সে আকাঙ্ক্ষিত ডাকটা শুনতে পাচ্ছে তার মঙ্গল কামনায় হাতের শাখা, সিঁথিতে সিন্দুর ছোঁওয়ায়। লোকটা তার শাঁখা-সিন্দুরের কোন মর্যাদাই দেয় নি , তবু সোহাগী আজও সে তারই মঙ্গল কামনায় এয়োতীর চিহ্ন দুটি বহন করে চলেছে। মাঝেমধ্যে সোহাগীর নিজেরই বড়ো আশ্চর্য লাগে। শুধু নিজের ক্ষেত্রেই নয় , তাদের পাড়ার অনেক মেয়ের ক্ষেত্রেও দেখেছে সিঁথিতে সিন্দুর পড়িয়ে দেওয়ার পর কোন কর্তব্য পালন করেন নি স্বামীরা। এমন কি মেয়েটি বেঁচে আছে না মারা গেল সে খোঁজ পর্যন্ত রাখেন না যে স্বামীরা তাদেরই মঙ্গলের জন্য হতভাগিনী মেয়েগুলো বছরের পর বছর সিঁথির সিন্দুর দুবেলা শাঁখা ছোওয়ায়। অচ্ছুৎ ফিমেল হলেও সোহাগীও তো মেয়ে। সহজাত সেই চিরন্তনী সংস্কারকে অমান্য করবে কেমন করে ?
ধারাবাহিক প্রতারণা আর লাঞ্ছনার কথা মনে পড়লেই নিজের জীবনটাই বৃথা মনে হয় সোহাগীর। তবু ছেলে-বৌমাকে আঁকড়ে সব অপ্রাপ্তি ভুলে থাকতে চায় সে। সবার ভাগ্যে সব কিছু থাকে না বলে মনকে প্রবোধ দেয়। ভগবান তো তবু তাকে ছেলে-বৌমাকে নিয়ে একটা সংসার দিয়েছে। অনেকের তো তাও নেই। নিজের মনকে যারা এভাবে সান্ত্বনা দিতে পারে তাদের কাছে দুঃখের ভাতও সুখের হয়ে ওঠে। যারা ভাবতে পারে এ জগতে আমার চেয়ে সুখী যেমন অনেকে আছে তেমনই দুঃখী মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তখন তাদের দুঃখটা প্রশমিত হয়ে যায়। দুঃখের মধ্যেই সুখ খুঁজে পায় তারা। সোহাগীও ছেলে-বৌয়ের সংসারে সেই সুখের সন্ধান পায়। সুখেই দিন কাটে তাদের তিনজনের সংসার। একদিন সুখের পাত্রটা যেন উপচে পড়ে। বছর ঘুরতেই তার ঘর আলো করে আসে নতুন অতিথি নাতি। নিজের ছেলের জন্মের সময় কেউ তার পাশে ছিল না। কিন্তু বৌমায়ের প্রসবের সময় শাশুড়ি নয় , মায়ের মতো পাশে থেকে সবদিক সামলায় সোহাগী। সুবর্ণাও অবাক হয়ে দেখে সব। তাই মনের আবেগ চেপে রাখতে পারে না। সোহাগীকে জড়িয়ে বলে , মা গো গর্ভধারিণী মাকে আমার মনে পড়ে না। কিন্তু তুমি আমার জন্য যা করলে তা নিজের পেটের মেয়ের জন্যও বহু মা করতে পারে না। তোমার পায়ে ঠাঁই না পেলে কোথায় ভেসে যেতাম তার ঠিক নেই।
— হয়েছে হয়েছে আর তোষামুদে কথা বলতে হবে তোকে।
— না গো মা তোষামুদে কথা নয় , আমি আমার মনের কথা বলছি।
— বেশ বাদ দে দেখি ওইসব কথা। আমি দাদুভাইয়ের শুভময় নাম রাখব ভেবেছি। কেমন হবে বল দেখি ?
— বাঃ দারুন নাম। তোমার ছেলের নামের সঙ্গে বেশ মানানসই হবে।
— শুধু মানানসই-ই নয় রে , আমি একটা কথা ভেবেই দাদুভাইয়ের জন্য নামটা ঠিক করেছি।
— কি কথা ?
— দেখ সুখময়ের জন্য আমার সংসার সুখের মুখ দেখেছে। আর শুভময়ের জন্য এবার থেকে সব কিছুই শুভ হবে। সেই কথা ভেবেই নামটা ঠিক করেছি। কি ঠিক হয় নি ?
—- তোমার নাতি তুমি ঠিক করেছ , আমি আর কি বলি বলো ?
— কেন নামটা তোর পচ্ছন্দ হয় নি ? উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করে সোহাগী।
শাশুড়ির কথা শুনে হেসে ফেলে সুবর্ণা। হাসতে হাসতে বলে , ওই দেখ আমি তোমাকে রাগানোর জন্য বললাম আর তুমি ধরতে পারলে না ? না গো সত্যি বলছি নামটা খুব সুন্দর হয়েছে। তাছাড়া আমি কথাটা কিন্তু ভুলও বলি নি। তুমি ঠাকুমা, নাতির নাম তুমি নিজের ইচ্ছে মতো রাখতেই পার। সে ভ্যাবলা – ক্যাবলা রাখলেও আমার আপত্তি নেই।
বলেই হেসে ওঠে সুবর্ণা। সোহাগীও সেই হাসিতে যোগ দেয়। প্রথা অনুযায়ী প্রসবের পর গঙ্গাস্নানে যাওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। নাহলে নাকি সংসারের কোন শুভকাজে অংশ নেওয়া যায় না। এতদিন শুভকাজ তো দুরের কথা , সেই অর্থে তো সোহাগীর সংসারই ছিল না। তাই ওইসব নিয়মেরও বালাই ছিল না। সুখের জন্মের পরও সেই নিয়ম পালনের কথা মনে হয় নি তার। কিন্তু এবারে তার সংসারে শুভময় এসেছে , তার শুভ কামনায় সবাইকে নিয়ে উর্দ্ধারণপুরে গঙ্গাস্নানের উদ্দ্যেশে রওনা দেয় সে। বাসেযেতে যেতেই স্মৃতি মেদুর হয়ে উঠে তার মন । লাভপুর থেকে পলাশপুর হয়েই উদ্ধারণপুর যায় বেশিরভাগ বাস। পলাশপুরে বাস ঢুকতেই জানলা দিয়ে চাইতেই একে এসে ছবির মতো ভেসে ওঠে তার মেয়েবেলা। ওই যে লক্ষীতলা , কত কিৎকিৎ খেলেছে ওখানে। ওই তো হারানকাকাদের বাড়ির পিছনে কাঁচামিঠে আমের গাছটা এখনও আছে। গ্রীষ্মের নির্জন দুপুরে দিদির সঙ্গে ঢিল ছুঁড়ে আম পাড়তে গিয়ে ধরা পড়ে কত বকা খেতে হয়েছে তার ঠিক নেই। মাষ্টারপাড়ার মোড় থেকে দেখা যায় দূরে পশ্চিমপাড়ার মাঠ। সেদিকে দৃষ্টি পড়তে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেদিনের সেই বৃষ্টিস্নাত নির্জন দুপুর। সেই বটপাতার মুকুট, সেই মোহন বাঁশি , সেই নূপুরের রুনুঝুনু। সেই ঠোঁটে থরোথরো ঠোঁটের কম্পন। জীবনের গাঙে বয়ে গিয়েছে কত জোয়ারভাঁটা , চুলে পাক ধরেছে , তবু সেদিনের সেই কথা ভেবে সোহাগীর মুখটা আরক্ত হয়ে ওঠে। সায়নটা কেমন আছে কে জানে ? সেও নিশ্চয় তারই মতো নাতিনাতনি নিয়ে চুটিয়ে ঘরসংসার করছে। লক্ষীতলা পার হতেই এক পলকে তাদের বাড়িটা দেখা যায়। বাড়িটা কি তাদের আদৌ ? ওই বাড়ির মধ্যে বাবাই একমাত্র তাদের সুতোর টান। সেই সুতোটাও যেন বেমক্কা ঝড়ে ছিঁড়ে গিয়েছে। বাবাই বা কেমন আছে কে জানে? কার্তিকটার জন্যও কেমন করে ওঠে। তারা দুই বোন যখন বাড়ি ছেড়ে আসে তখন কার্তিক তাদের খুব ন্যাওটা ছিল। তখনও তার মধ্যে ভেদবুদ্ধি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে নি। কার্তিক কি সেই রকমই আছে ? এই রাস্তার উপরে কতবার বাসে বিভিন্ন জায়গায় গান করতে গিয়েছে। প্রতিবারই যাওয়ার সময় বাবা -সায়ন কিন্বা কোন ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে একপলকের দেখার প্রত্যাশায় তৃষ্ণার্ত চোখে জানালার দিকে চেয়ে থেকেছে। কিন্তু কোনবারই তার সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় নি। কতবার মনে মনে ভেবেছে ভাইফোঁটায় বাড়ি যাওয়ার কথা। কিন্তু ছন্দার বিয়ের দিনের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ভেবে সেই ইচ্ছাও দমন করতে হয়েছে তাকে। ভাইফোঁটার দিন যখন ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিয়ে বোনেরা শাঁখ বাজিয়ে উলুধ্বনি দিয়েছে তখন সে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছে। মনে মনে ভগবানকে জিজ্ঞেসা করেছে , ঠাকুর আমরা দু’বোন কি এমন পাপ করেছিলাম , যে তুমি আমাদের সব দিক থেকে এভাবে বঞ্চিত করলে ? ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিতে পারে না তবু ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় প্রতিবছর ভাইফোঁটার দিনে ঘরের চৌকাঠে ফোঁটা দিয়েছে সে। পুরনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতেই উর্দ্ধারণপুরের ঘাটে পৌছোয় তারা। স্নানঘাটের অদুরেই শ্মশান। শ্মশানঘাটের
দিকে নজর পড়তে চমকে যায় সোহাগী। সার দিয়ে ভিক্ষারীরা সব খোল করতাল বাজিয়ে ভিক্ষা করছে। তাদের মাঝে খঞ্জনি বাজিয়ে কাকে ভিক্ষা করতে দেখছে সে ? ছেলে – বৌমাকে বলে , তোরা একে একে স্নান সার গিয়ে।
— কেন তুমি কি করবে ? সুখময় জিজ্ঞেস করে।
— তোরা যা না , আমি আসছি। ওইখানে আমাদের গ্রামের একজনকে আছে মনে হচ্ছে , আমি একটু দেখে আসছি।
সুখময়দের আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ভিক্ষারীর লাইনের দিকে এগিয়ে যায় সোহাগী। সামনে গিয়েই বাকরুদ্ধ হয়ে যায় । তার আন্দাজ ভুল হয় নি। ততক্ষণে খঞ্জনি থামিয়ে চোখ না তুলেই ভিখিরিটি হাত বাড়িয়ে বলে — হরিবোল , কিছু ভিক্ষা দাও মা।
আর সইতে পারে না সোহাগী। ফুঁপিয়ে ওঠে সে। অশ্রুরুদ্ধ গলায় বলে — তুই ভিক্ষা করছিস ?
সেই কথা শুনেই মুখ তুলে তাকিয়ে ভিক্ষারীও যেন হতভম্ব হয়ে পড়ে। খঞ্জনী গুটিয়ে সে পালানোর চেষ্টা করে। সোহাগী খপ করে তার হাতটা চেপে ধরে বলে — কি রে , কোন জবাব না দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিস কেন ? আয় এদিকে আয়।
ভিখারীর হাত ধরে অদুরের বাঁধানো বটতলায় নিয়ে মুখোমুখি বসে ফের প্রশ্নটা তোলে সোহাগী। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না সায়নও। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সে। তার দু’হাত ধরে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলে সোহাগী। একটুক্ষণ সামলে নিয়ে সায়ন যা বলে তা শুনে চমকে যায় সোহাগী। তার দিব্যির জন্যই তো প্রীতিকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছিল সায়ন। সেই প্রীতিই সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে রাজমিস্ত্রির সঙ্গে পালাবে তা কে জানত? সোহাগী তো জানত প্রীতিও সায়নকে ভালবাসে। কিন্তু সেটা যে আসলে তার সঙ্গে ভালোবাসার প্রতিযোগিতায় লড়াই ছিল তা উপলব্ধি করতে পারে নি সোহাগী। ছেলেবৌয়ের সংসারেও ঠাঁই হয় নি সায়নের। তাই পেটের দায়ে ভিক্ষাবৃত্তি। লজ্জায় গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করতে পারে না। বেশ কয়েক বছর হলো শ্মশানঘাটেই আস্তানা গেড়েছে। এখানে কেউ কাউকে চেনে না। পরিজনদের দাহ করতে আসার সময় মনটা শবযাত্রীদের মনটা উদার থাকে। তাই অল্পক্ষণের মধ্যেই পেটের ভাতের যোগাড় হয়ে যায়। তারপর যে যার ডেরায় ফিরে যায়। এখানে এটাই দস্তুর। পেটের ভাতের যোগাড় হয়ে গেলেই আর কেউ হাত পেতে বসে থাকে না। তখন অন্যজনকে পেটের ভাতের যোগাড় করার জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়। শুনেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হয় তার। তার জন্যই তো প্রীতিকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছিল সায়ন। অন্য কাউকে বিয়ে করলে হয়তো তার জীবনটা অন্যখাতেও বইতে পারত। সায়নের কাছে বাবার খবরও পায়। শেফালীপিসির বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা নাকি তাকে অনেক খুঁজেছিল। খোঁজ না পেয়ে মাথার গন্ডগোল দেখা দেয়। একদিন ওই অবস্থায় দিদির খোঁজে কলকাতা চলে যায়। তারপর আর ফেরে নি। আর তার কিছুদিন পরই শান্তিবালা এসে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়িঘর বিক্রি করে নতুনমা আর কার্তিককে নিয়ে চলে যায়। শুনতে শুনতে সোহাগী চোখ জলে ভরে যায়। বাবার ওই পরিনতির জন্যও নিজেকে দায়ী মনে হয় তার। সেদিন শেফালীপিসির বাড়ি থেকে পালিয়ে না গেলে হয়তো বাবার ওই পরিস্থিতি হত না। চোখ মুছে দেখে সায়নও তার দিকে কান্না ভেজা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। সোহাগী তার হাত দুটো ধরে বলে , তোর যে এত কষ্ট, খোঁজ করে আমার কাছে গেলেই তো পারতিস ?
আগের মতোই অভিমানে ঠোঁট তিরতির ওঠে সায়নের। বাচ্চা ছেলেদের মতোই বলে , খোঁজ করতে হবে কেন ? আমি তো জানতাম তুই কোথায় আছিস। বহু জায়গায় লুকিয়ে তোর অভিনয়ও দেখে এসেছি।
—- তবু তুই আমার কাছে যাস নি ?
—- কেন যাব , তুই আমার কে ?
এবারে অভিমানের মেঘ জমে সোহাগীর মুখে। সেও অভিমানহত গলায় বলে , ঠিকই বলেছিস , আমি তোর কে ?
—- ওই দেখ , অমনি অভিমান হয়ে গেল তো ? আরে বাবা , বুঝিস না কেন তুই মাথায় হাত রেখে দিব্যি করিয়ে নেওয়ার পর আমি তোর সামনে কি করে যায় বল দেখি ? তোর যদি তাতে কোন ক্ষতি হয়ে যেত তাহলে আমি সইতে পারতাম ?
— তুই সেই কথা ভেবেই এত সব একা ভোগ করলি ?
— হ্যা রে তোর কাছে সত্যবদ্ধ হয়েছিলাম। কি করে খেলাপ করি বল ?
— তোর আমার জন্য মন খারাপ করত না ? দেখতে ইচ্ছা হত না ?
—- হতোই তো , আর ইচ্ছা পূরণের জন্যই তো এই শ্মশানে পড়ে থাকা।
—- মানে ?
—- পরপারে যেতে হলে তো তোকে এই শ্মশানঘাট হয়েই যেতে হত , সেদিন দুচোখ ভরে তোকে দেখে নিতাম। আর আমিই যদি আগে চলে যেতাম তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই যেত।
সায়নের কথা শেষ হয় না। ফুঁপিয়ে ওঠে সোহাগী। অশ্রুরুদ্ধ গলায় বলে, ওরে এমন করে বলিস না। আমি যে আর সইতে পারছি। আমি আমার দিব্যি ফিরিয়ে নিলাম। কোন কথা শুনব না। তুই আজই আমার সঙ্গে চল।
—- না রে তা হয় না।
—- কেন হয় না ?
—- ছেলে-বৌমা-নাতি নিয়ে তোর সুখের সংসার। সেখানে আমি কি পরিচয় নিয়ে থাকব বলত ?
—- সে আমি বুঝব , তুই চল তো আমার সঙ্গে।
—- এতখানি বয়স হলো তবু তুই যেন সেই ছোট্টটি রয়ে গিয়েছিস। কেন অবুঝের মতো জোর করছিস ?
—- তাহলে কি তোর সঙ্গে আমার কোনদিন দেখা হবে না?
—- যদি ভগবান চান তাহলে হয়তো হবে।
— বেশ আমি সেই দিনটার জন্যই জন্মজন্মান্তর ধরে অপেক্ষা করব। কিন্তু আমার একটা কথা তোকে রাখতেই হবে।
— কি কথা ?
সোহাগী ব্যাগ খুলে কয়েকটা টাকা বের করে সায়নের হাতে দিয়ে বলে , এটা তোকে রাখতেই হবে।
সায়ন সেটা সোহাগীর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলে , তাহলে তোকে আগে কি বললাম। পেটের ভাতের যোগাড় হয়ে গেলে কারও থেকে উদ্বৃত্ত নেওয়া যায় না।
— কিন্তু বিপদ আপদ কিছু হলে ?
আকাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে সায়ন বলে — উনিই ভরসা। বিপদআপদ কিছু হলে টাকাপয়সা দিয়ে পার পাওয়া যায় না রে। তবে সত্যি যদি কিছু দিয়ে চাস তাহলে পাঁচটা টাকা ভিক্ষা আমাকে দিয়ে যেতে পারিস। আমার আজ পেটের ভাতের যোগাড় হয় নি। তুই তুলে নিয়ে চলে আসার পর আমার জায়গায় আর একজন বসে পড়ছেন। তার পেটের ভাতের যোগাড় না হলে আমি তো আর বসার জায়গা পাব না।
আর নিতে পারে না সোহাগী। প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। বিমুখ হয়ে সায়নের পাতা হাতে একটা পাঁচ টাকার কয়েন ফেলে দিয়ে আঁচলে মুখ ঢেকে ফোঁপাতে ফোঁপাতে স্নানের ঘাটের দিকে ছুটে যায়।

( ক্রমশ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)