ফিমেল – ৩৯

ফিমেল

অর্ঘ্য ঘোষ

( ৩৯ )

এই রকম সময়ে মানুষ পাশে আপনার জনকে পাশে দেখতে চায়। কিন্তু সোহাগীর আপনারজনরা তো আর আপনার নেই। শুধু পোষা কুকুরটা তার ওই অবস্থা দেখে কেমন যেন এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় ডেকেই চলে। সোহাগী মনে মনে ভাব যাক তবু তো একজন আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ সবাইকে গরু ছাগলের মতোই ভ্যানে তুলে নিয়ে গিয়ে লকআপে। চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দুরের কথা , এক ফোঁটা জল পর্যন্ত দেওয়া হয় না তাদের। অবোধ শিশুগুলোও বাদ যায় না। লকআপের ভিতর যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকে সবাই।
বাবা-মায়েদের ওই অবস্থা দেখে বাচ্চাগুলোও সমানে কেঁদে চলে। তারাও খিদে তেষ্টা ভুলে যায়। লকআপের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা গুনতি করার সময় বড়োবাবু অশ্রাব্য খিস্তি দিয়ে বলেন , থাক সব পড়ে। কাল সকালে একবার হাসপাতাল ঘুরিয়ে কোর্টে চালান করে দেব। ওখানেই তোদের পুনবার্সন হয়ে যাবে। কথা বলা কিম্বা শোনার মতো অবস্থা ছিল না সোহাগীদের। সাংবাদিকদের সবকিছু বলার সুযোগ হল না বলে সোহাগীর খুব আক্ষেপ হয়। লাঠি চালানোর পর সাংবাদিকদের তাদের কাছে ঘেঁষতেই দেয়নি পুলিশ। তবু দূর থেকেই তারা তাদের রক্তাক্ত ছবি আর যন্ত্রণায় গোঙানির শব্দ ক্যামেরাবন্দী করে নিয়ে গিয়েছেন। সময় গড়িয়ে যায়। বাইরে কি হচ্ছে তা জানতে পারে না সোহাগীরা। কিন্তু জল অনেক দুর গড়ায়। সমস্ত সংবাদ মাধ্যমে বড়ো বড়ো হেডিং দিয়ে ছাপা হয় খবরটা। কোথাও ছাপা হয় , ‘মাথা গোঁজার ঠাই চেয়ে জুটল মাথায় পুলিশের লাঠি’। কোথাও আবার লেখা হয়, ‘শান্তিপূর্ণ অবস্থানে শিশু – মহিলাদের নির্বিচারে পেটাল পুলিশ’। ছাপা হয় আহতদের রক্তাক্ত যন্ত্রনা কাতর ছবিও। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দৌলতে ওই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সারা রাজ্য তথা দেশ জুড়ে ছিছিকার ওঠে। মানবাধিকার কমিশন , মহিলা সংগঠনগুলি সরব হয়। নিন্দায় সরব হন শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবিদের একাংশও। খোদ রাজ্যপাল ঘটনার নিন্দা করে সংবাদ মাধ্যমে বিবৃত্তি দেন। বিধানসভায় হইচই বাধিয়ে দেন বিরোধীদলের বিধায়করা। মুখ্যমন্ত্রীর বিবৃত্তি দাবি করে ওয়াকআউট করেন তারা। শাসকদলের অন্দরেও সমালোচনা শুরু হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই বলতে শুরু করেন, সামনেই পঞ্চায়েত ভোট। এই সময় এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও হত। বিরোধীরা বিষয়টি ইস্যু করতে পারে। তাদের আশঙ্কাই যেন সত্যি হয়। বিরোধী দলনেতা সুমন কল্যাণ বিধানসভায় ঘোষণা করে দেন, ওইসব শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলতে তারা ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন। কার্যত ল্যাজেগোবরে অবস্থা হয়ে ওঠে সরকারের। বিরোধীরা পরিস্থিতির সুযোগ নিজেদের হাতে নিতে চলেছে দেখে মুখ্যমন্ত্রীও ঘোষণা করে দেন , এলাকার বিধায়কের নেতৃত্বে সরকারি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হচ্ছে।
বাইরের এত সব ঘটনা অবশ্য বিন্দুবিসর্গও জানতে পারে না সোহাগীরা। তখন তারা যন্ত্রণা অনাগত ভবিষতের দুশ্চিন্তায় কাহিল হয়ে পড়েছে। সেইসময় লকআপ খুলে ঘরে ঢোকেন বড়বাবু। চুলের মুঠি ধরে দাঁড় করান সবাইকে। মুখের সামনে বেতের লাঠিটা নাচিয়ে বলেন , যা বলছি কান খুলে শুনে রাখ, এবার থেকে যেই আসুক বলবি তোরা আগে পুলিশকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়েছিস। পুলিশ তোদের তাড়া করে গেলে ছুটে পালানোর সময় পড়ে গিয়ে তোদের এই হাল হয়েছে। কথাগুলো শুনে সবাই সোহাগীর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। বিষয়টি বুঝতে পারেন বড়বাবু। এগিয়ে গিয়ে সোহাগীর ফাটা চিবুকটা লাঠিটা দিয়ে একটু তুলে ধরেন। দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রনাটা হজম করে সোহাগী। বড়বাবুর অবশ্য তাতে কোন হেলদোল নেই। বরং বাচ্চাদের সামনে খিস্তি করে বলেন , যা বললাম তার একটু বেচাল হলেই এমন ক্যালান ক্যালাব একমাস বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবি না। আর যখন উঠবি তখন বাপমায়ের নাম ভুলে যাবি। যেদিন বাপমায়ের নাম মনে পড়বে সেদিন নিজের নাম ভুলে যাবি। বুঝলি বেজন্মার দল।
— স্যার, আমরা তো কবেই শুয়ে পড়েছি। ভুলতে বসেছি বাবা-মা এমনকি বাবা মায়ের দেওয়া নিজের নামটাও। আপনি আর নতুন করে কি ভোলাবেন? প্রশ্নটা সোহাগীর ঠোটের ডগায় চলে এসেছিল, কোন রকমে সামলে নেয়। সোহাগী ভেবে পায় না তাদের উপরে পুলিশের এত রাগ কেন ? তারা তো পুলিশের কোন পাকা ধানে মই দেয় নি। তারা তাদের সামান্য একটু মাথা গোঁজার ঠাই চেয়েছিল মাত্র। পুলিশেরও তো বাড়িতে বাবা-মা ভাই বোন আছে। তাহলে তারা যখন অন্যের বাবা-মা, ভাই-বোনকে খিস্তি কিম্বা লাঠিপেটা করে তখন কি একবারও মনে হয় না তাদের পরিবারের সঙ্গে যদি কেউ এমন করে ? যদি তাদেরই মতো বাবা-মা’কে ছেলের বয়সী কেউ তুই তোকারি করে কথা বলে তাহলে কেমন লাগবে ?
বড়বাবু লকআপ থেকে বেরিয়ে যেতেই হঠাৎ থানায় সাজো সাজো রব পড়ে যায়। বিকালের দিকে অভুক্ত মানুষগুলোকে লকআপ থেকে বের করে হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে আনা হয়। দেওয়া হয় মাংস রুটি। হঠাৎ হলোটা কি পুলিশের — ভেবে পায় না সোহাগী। কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যায় তাদের কাছে। গরাদের ফাঁক থেকেই তারা দেখতে পায় থানার সামনে দুধ সাদা গাড়ি থেকে নামছেন চকচকে পোশাক পড়া কিছু মানুষ। বড়বাবুর কাছে অনুমতি নিয়ে লকআপের সামনে এসে দাঁড়ান তারা। তাদের মধ্যে একজন হাতজোড় করে বলেন , আমি বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। আপনাদের কথা সব শুনেছি। আমাদের দল ক্ষমতায় থাকলে এমনটা হোত না। আমাদের সরিয়ে যে আপনারা কতবড়ো ভুল করেছেন তা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। যাই হোক সামনেই পঞ্চায়েত ভোট , আমাদের ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনে সেই ভুলের সংশোধন করুন।
আর ওইভাবে কোন দলের ব্যানার ছাড়া আন্দোলন করাও যায় না। আমাদের দলে আসুন , আপনাদের দাবির বিষয়টি আমরা বিধানসভায় তুলব।
বিরোধী দলনেতার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে যায় সোহাগীর। লোকটা বলে কি ? এখানেও সেই ভোট। দেখছে তারা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে , সে নিয়ে কোন কথা নেই , তাদের সমস্যা নিয়ে কোন কথা নেই , স্রেফ ভোটের কথা বলতেই অত দুর থেকে আসা ? ভোট ছাড়া কি রাজনীতির লোকেরা কিছুই বোঝে না ? নিজেদের দাবি জানাতে গেলেও রাজনৈতিক দলে নাম লেখাতেই হবে ? রাজনৈতিক দলে নাম লেখানো না হলে তাদের সমস্যার কথা বিধানসভায় তুলে ধরা যাবে না ? ওইসব কথা ভাবতে ভাবতেই সোহাগী লকআপের গরাদের ফাঁক থেকেই দেখতে পায় থানা জুড়ে কেমন যেন একটা চাঞ্চল্যের ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। থানায় যে আবার কেউ আসছে তা ওই চাঞ্চল দেখেই বুঝতে পারে সে। তার অনুমানই সত্যি হয়। বিরোধী দলনেতারা চলে যেতেই সন্ধ্যার মুখেই হুটার বাজিয়ে থানার সামনে এসে দাঁড়ায় চকচকে গাড়ির বিশাল এক কনভয়। গোটা থানা চত্বর পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ হয়ে যায়। সোহাগী দেখে বিধায়ক সানিরুল ইসলামের সঙ্গে গাড়ি থেকে নামছেন ফর্সা পাজামা- পাঞ্জাবী পড়া একটি লোক। সংবাদ মাধ্যমের দৌলতে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ভুতনাথ মিশ্রকে চিনতে অসুবিধা হয় না সোহাগীর।এত আয়োজন দেখে সোহাগী ভাবে , দুদিন ধরে তাদের ঘটনাটা ঘিরে যে হারে খরচ হচ্ছে তার সামান্য একটা অংশ খরচ করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু কে’ই বা আর কবে এভাবে ভেবেছে ? সরকার একটা গৌরী সেন বই তো নয়। সরকার যারা চালায় তাদের কাছে গৌরী সেনের টাকা অপব্যয় হলে কি’ই বা এসে যায় ?
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেন্ট্রি তাদের বের করে নিয়ে যায় বড় একটি হলঘরে। সেখানে তখন উল্টো দিকের চেয়ারে বসে রয়েছেন মন্ত্রী, বিধায়ক সহ আরও সব চকচকে পোশাক পড়া লোকেরা। পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন, বি, ডি,ও, থানার বড়োবাবু, শাসক দলের নেতা আব্দুল হান্নানরা। বি,ডি,ও,বড়োবাবুর দিকে চেয়ে মন্ত্রী বলেন , পরিস্থিতি এতদুর গড়াতে দিলেন কেন ? হাত কচলে বি,ডি,ও এবং বড়োবাবু এমন কি শাসক দলের নেতা হান্নানও বলে উঠেন , স্যার এদের পুনবার্সণের ব্যবস্থা করে দেব বলা হয়েছিল। কিন্তু ওরা বিরোধীদলের কথা শুনে পাকাপাকি ভাবে তারাশংকর ভবনটাই চাইছিল।
ওদের কথা শুনে ‘থ’ হয়ে যায় সোহাগী। অভিনয়টাও যে ওরা তাদের চেয়ে ভালোই করে তা উপলব্ধি করে সে। কিন্তু সে আর বেশীক্ষণ ওদের অতি নাটকীয়তা সহ্য করতে পারে না । হাত জোড় করে বলে , না স্যার আমরা সবাই বরাবর কাদাছিটে বাড়িতে থাকতে অভ্যস্ত। পাকাপাকিভাবে অত বড়ো পাকা বাড়িতে থাকতেও পারব না। সে মোহও আমাদের নেই। আমরা চেয়েছিলাম যে কোন একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই। যতদিন সেটা না হয় ততদিন আমাদের আমাদের সেখানে থাকতে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছিলাম মাত্র। তালাবন্ধ হয়ে পড়ে থেকে সাপখোপের বাসা হওয়ার চেয়ে আমরা থাকলে কি এমন ক্ষতি হোত বলুন স্যার ? আর কোন দলের কথা শুনেও নয়, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে বলেই ওই দাবি জানাতে বাধ্য হয়েছি স্যার।
সব শুনে মন্ত্রী বলেন , হুম। দেখছি আলোচনা করে আপনাদের জন্য কি করা যায়।
তারপর মন্ত্রী উঠে বড়োবাবুর ঘরে যান। যেতে যেতেই নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলেন তারা। সোহাগী শুনতে পায় বি,ডি,ও মন্ত্রীকে বলছেন , এভাবে ওদের দাবি মেনে নিলে এরপর থেকে সবাই তো ছোটখাটো বিষয় নিয়েও আন্দোলন শুরু করে দেবে। লোকাল প্রশাসন চালানোটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে স্যার।
চাপা গলায় মন্ত্রী বলেন , আহা বোঝেন না কেন সামনেই ভোট। বিরোধীদের বিষয়টিকে কিছুতেই ইস্যু করতে দেওয়া হবে না। বরং আমাদের সহানুভূতিসম্পন্ন ভাবমূর্তিটাই তুলে ধরে ভোট করতে হবে। সেই কথা শুনে হাত কচলে বি,ডি,ও বলেন , আর বলতে হবে না বুঝেছি স্যার। কিছুক্ষণ পর বিধায়ক এসে জানান , শুনুন আমাদের মুখ্যমন্ত্রী আপনাদের মতো মানুষের প্রতি খুব সদয়। তিনিও চান না আপনারা নিরাশ্রয় হয়ে পড়ুন। তাই উনি আপনাদের সবার জন্য জায়গা সহ একটি করে বাড়ি তৈরি করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আর যতদিন তা না হয় ততদিন আপনারা তারাশংকর ভবনেই থাকবেন। অভিনয়ের চর্চাও করতে পারবেন। শুধু তাই নয়, আপনারা নিজের বাড়িতে চলে আসার পরও তারাশংকর ভবনে সবাই সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ পাবেন। এজন্য ওই ভবনে আধুনিকীকরণ করা হবে। আর আপনাদের নিঃশর্তে মুক্তি দেওয়া হল। আজ রাতটুকুর মতো আপনারা নিজের বাড়িতে গিয়ে থাকুন। কাল বি,ডি,ও অফিসের লোক গিয়ে আপনাদের তারাশংকর ভবনের তালা খুলে দিয়ে আসবে। বিধায়কের কথা শেষ হতে না হতেই হাততালিতে ফেটে পড়ে সবাই। সোহাগীকে জড়িয়ে ধরে বৃন্দারা বলে ওঠে, দিদি তোমার জন্যই এমনটা সম্বব হলো। চলো চলো এবার বাড়ি চলো।
তখন যুদ্ধ জয়ের আনন্দ সবার চোখে মুখে। সেই আনন্দই ওদের ভুলিয়ে দেয় সব যন্ত্রনা। স্থান- কাল- পাত্র ভুলে ওরা বাচ্চাদের মতো পরস্পরকে জড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে — হিপ হিপ হুররে।

( ক্রমশ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)