ফিমেল – ৩৮

ফিমেল

অর্ঘ্য ঘোষ

(৩৮)

সব কিছু তুচ্ছ করে শুরু হয়ে যায় জোরদার প্রতিরোধের প্রস্তুতি। সন্ধ্যের মুখে থানা থেকে লোক এসে বলে যায়, শেষবারের মতো ১২ ঘন্টা সময় দেওয়া হচ্ছে।অনত্র সরে যাওয়ার জন্য। এরপর জেদ ধরে বসে থাকলে তার পরিনাম হবে মারাত্মক। শাসকদলের প্রতিনিধিরাও শাসিয়ে যায় , বিরোধী দলের উসকানিতে নাচছো তো, বুঝবে মজা। সোহাগীরা জানিয়ে দেয় , আমরা কারও উসকানিতে নাচছি না। কেউ আমাদের কথা ভাবে নি। তাই নিতান্ত বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে । কারণ আমাদের তো আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। যা হওয়ার হবে , আমরা ঘর ছেড়ে বেরোব না। ঘর চাপা পড়ে মরতে হয় মরব। ভালোই হবে সব চুকে যাবে।
সেদিন রাতে আর কেউ নিজের ঘরে যায় ফেরে না। এক জায়গায় রান্না করা হয়। কিন্তু দুশ্চিন্তায় বড়োরা কেউ মুখে খাবার তুলতে পারে না। ছোটদের খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে গোল হয়ে আলোচনায় বসে সবাই। সোহাগী বলে , কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে ঘরে বসে থাকলে ওরা খুব সহজে ভাঙতে পারবে বলে মনে হয় না।
কথাটা বলেই কেমন যেন খটকা লাগে সোহাগীর। তার এই কথাটা অন্যরা কেমন ভাবে নেবে কে জানে! ভাববে না তো নিজের নাতিটি তো আসবে না , অন্যের ছেলেমেয়ের প্রাণ বাজি ধরছে সে। কিন্তু সে তো তা চাই নি। সে চেয়েছিল , সবার মতো তার ছেলে-বৌমা, নাতিও থাকুক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে। কিন্তু ছেলে যে লোভের ফাঁদে গলা ঢুকিয়ে বসে আছে। অস্বস্তির ছাপ ফুটে ওঠে তার চোখে মুখে। সোহাগীর মনের ভাবটা বুঝতে পারে বৃন্দারা। তাই তারা বলে , তুমি কিছু ভেব না তো দিদি। ছেলের নিষেধ উপেক্ষা করে তুমি যে আমাদের সঙ্গে আছো তাতেই আমরা খুশী। আর আমাদের কাউকে চায় না। পরিবেশটা ভারি হয়ে যাচ্ছে দেখে ভজনকাকা বলে ওঠেন , ঘরের ভিতরে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে তার তো কিছু ঠিক নেই। তাহলে খাবার-দাবারের ব্যবস্থাও তো করে রাখতে হবে নাকি ? আমাদের নাহয় পেটে গামছা বেধে পড়ে থাকার অভ্যাস আছে , কিন্তু বাচ্চাগুলোর তো ঘন্টায় ঘন্টায় খাবার চাইবে। সোহাগী বলে , ঠিক বলেছো ওদের ভুলিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন রকম শুকনো খারার আনতে হবে। যে যা পারো দাও। তাই দিয়ে বাচ্চাদের খাবার আর অন্যান্য বাজারও সন্ধ্যেবেলায় করে আনবে। সন্ধ্যে থেকেই সাজো সাজো রব পড়ে যায় যাত্রাপাড়ায়। সবাইকে যেন কথায় পেয়েছে আজ। কোথাই এই রকম আন্দোলন করে কি হয়েছিল সেই সব শোনা কথা আলোচিত হয় গভীর রাত্রি পর্যন্ত। ওইসব কথা বলেই নিজেদের মনোবল ধরে চেষ্টা করে তারা। কেউ কেউ বলে , আচ্ছা ওই টিভি, কাগজওয়ালাদের একটা খবর দিলে হয় না ?
সোহাগী বলে , খুব ভালো বলেছো। ওরা থাকলে পুলিশ প্রশাসনের লোকেরা বাড়াবাড়ি করতে একটু ভয় পাবে। কিন্তু এখন তাদের খোঁজ কি করে মিলবে ?
ভজনকাকা বলেন, চিন্তা কোর না। ওরা হচ্ছে বানের আগে হদো। ঠিক দেখবে খবর পেয়ে নিজে থেকেই চলে আসবে।
—- সেটা হলেই ভালো হয়। আমাদের সমস্যার কথাটা ওদের কাছে তুলে ধরতে হবে। নাহলে প্রশাসন আর পার্টির লোকেরা আমাদের সম্পর্কে ওদের উলটো বোঝাবে। তাহলে অনেকে আমাদের ভুল বুঝতে পারে। সেটা কিছুতেই হতে দেওয়া হবে না।
কথা বলতে বলতেই যে যেখানে পারে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম আসে না কেবল সোহাগের চোখে। সে ভাবতে থাকে কি যে হবে শেষ পর্যন্ত কে জানে! ছেলে বৌমা পর হয়ে গেল। নাতিটাকেও আর আসতে দেয় না তার কাছে। হাজার ব্যস্ততার মাঝেও সকালে – বিকালে নাতিকে নিয়ে যে বাঁধা রুটিন ছিল , কয়েকদিন ধরে তাও বন্ধ। ছেলে-বৌমাই এখন তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে নাতিকে স্কুল এবং পার্কে নিয়ে যায়। নাতিটা কেমন করুন দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকে। মা-বাবা তার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলে যায়। কোনদিন কি আর সম্পর্কটা স্বাভাবিক হবে না ? ভাবতে ভাবতেই জল গড়ায় সোহাগীর চোখে। সেই জল শুকিয়েও যায়। কখন যেন একটু তন্দ্রার ভাব আসে তার। হঠাৎ সোরগোল পড়ে যায় যাত্রাপাড়ায়। সচকিত হয়ে উঠে সবাই। তখন সবে আলো ফুটি ফুটি ভোর। অদুরে মল্লিকদের বাগানে পাখিদের কিচির মিচির আর ডানা ঝাপটনোর শব্দ জানান দিচ্ছে রাত্রি শেষের বার্তা। আচমকা সজোরে কড়া নড়ে ওঠে দরজার। ঘুম ভেঙে বাচ্চাগুলো ফের পাশ ফিরে শোয়। দরজা খুলে বেড়িয়ে আসে সোহাগীরা। আর চোখ খুলে চাইতেই হতচকিত হয়ে পড়ে তারা। দেখা যায় , সাতসকালেই যাত্রাপাড়া ঢোকার মুখেই যমদুতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রশাসনের বিশালাকার বুলড্রোজার। বি,ডি, ও, থানার বড়োবাবুরা সব প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে পায়চারি করছে। পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। এক পুলিশকর্মী কাঁধে মাইক ঝুলিয়ে ঘোষণা করছেন , যাত্রাপাড়ার বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে জানানো যাইতেছে যে , ইতিপূর্বে আপনাদের বহুবার সরকারি জায়গা দখল মুক্ত করিবার কথা বলা হইয়াছিল। কিন্তু আপনারা কর্ণপাত করেন নাই। এক্ষণে আপনাদের এক ঘন্টা সময় দেওয়া হইতেছে , আপনারা অন্যত্র উঠিয়া যান। নচেৎ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।
ওই ঘোষণা শুনেই শুরু হয়ে যায় পারস্পরিক মুখ চাওয়া চাওয়ি। যাত্রাপাড়া ছাড়াও যাদের ঘর ভাঙার আশঙ্কা রয়েছে গোলমাল শুনে এসেছিলেন তারাও। কিন্তু বিরাট পুলিশ বাহিনী দেখে আর ওই ঘোষণা শোনার পর একে একে গুটি গুটি পায়ে যাত্রাপাড়া ছেড়ে চলে যান তারা। যাত্রাপাড়ার মানুষগুলো যেন একেবারে একা হয়ে যায়। সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সোহাগীর দিকে। সোহাগী অবশ্য মনোবল হারায় না। সে প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে , দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে আমাদের। পিছোনোর তো আর জায়গা নেই। যাই হোক না কেন , দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হবে। চলো সবাই একসঙ্গে ঘরে গিয়ে বসি।
সেই সময় এসে পৌঁছোন একদল সাংবাদিক। তাদের দেখে কিছুটা যেন স্বস্তি ফেরে যাত্রাপাড়ার মানুষগুলোর । ওসি, বি,ডি,ও’রা তাদের উদ্দেশ্য বলে , আপনারাও এসে গিয়েছেন দেখছি। এত সাতসকালে কে খবর দিল আপনাদের ?
সাংবাদিকদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে বলে , আপনারা কি ভেবেছিলেন চুপি চুপি সব সেরে ফেলবেন ? কেউ টের পাবে না ? আপনারা তো নিজেদের প্রচারমূলক খবর ছাড়া কিছু দেন না, কিন্তু আমাদের খবর দেওয়ার লোকের অভাব নেই।
জবাবে বি, ডি,ও ওই সাংবাদিককে বলেন , কিন্তু আপনারা তো ছবি তুলতে পাবেন না। সে অনুমতি নেই। সাংবাদিকও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তিনি সাফ জানিয়ে দেন , প্রকাশ্যে আপনারা যা করতে পারেন তার ছবি তোলার অধিকার সংবাদ মাধ্যমেরও আছে। তার জন্য কারও অনুমতির দরকার হয় না। তার চেয়ে বরং আপনারা আপনাদের কাজ করুন। আমাদেরও কাজ করতে দিন। আর কথা বাড়ান না বি,ডি,ও।
ওই বাদানুবাদ কিছুটা ভরসা যোগায় সোহাগীদের। তারা সাংবাদিকদের হাতে তাদের দাবিপত্রের কপি তুলে দেয়। সব দেখে সাংবাদিকরা বলেন , আশ্চর্য তো এত জায়গায় জানিয়েও কোন রেসপন্স মেলেনি ? সোহাগী বলে, বিশ্বাস করুন ভাই আপনারা ছাড়া আমাদের সমস্যার কথাটা এর আগে কেউ ভালোভাবে শোনেই নি। মাঝপথেই কথা বন্ধ হয়ে যায় সোহাগীর। ফের বেজে ওঠে মাইক। ঘোষণা হয় , আর মাত্র ৫ মিনিট সময় আছে। আপনারা বাইরে আসুন। প্রশাসন আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়।
ঘোষণা শুনে এগিয়ে যায় সোহাগী। বি , ডি, ও সাহেবের মুখোমুখি দাঁড়ায় সে। নম্র স্বরেই বলে , বলুন কি বলতে চান।
বি,ডি,ও বলেন, আপনাদের সেদিনই তো জানিয়ে দিয়েছিলাম জায়গা ছেড়ে উঠে যেতে হবে।
সোহাগী বলে , আমরাও তো স্যার আপনাকে বলেছিলাম আমাদের যাওয়ার আর জায়গা নেই। আমাদের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁইয়ের ব্যবস্থা করে দিন। আজকেও বলছি , দিন একটা কিছু ব্যবস্থা করে আমরা সবাই সরে যাচ্ছি।
সোহাগীর কথা শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বি, ডি, ও বলেন, এতগুলো লোকের ব্যবস্থা করে দিন বললেই তো আর হোল না।
— কেন স্যার, তারাশংকর ভবনটা তো খালি পড়েই আছে। সেখানেই আমাদের অস্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দিন আপাতত। তারপর না একটা করে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে দেবেন। আমরা উঠে চলে যাব। সরকার তো শুনি এত এত করছে। আমাদের মতো দুস্থ শিল্পীদের জন্য কি কিছুই করার নেই ? বি, ডি, ও সাহেবের দিকে চেয়ে প্রশ্নটা ছূড়ে দেয় সোহাগী।
রাগের মাত্রা চড়তে থাকে বি, ডি, ও তামালকৃষ্ণ বিশ্বাসের। দাঁত খিচিয়ে বলেন , মামার বাড়ির আবদার আর কি। ওনারা বলবেন আর সরকারি ভবনে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
সোহাগীও কম যায় না। গলা চড়িয়ে সেও বলে , কেন দিতে দোষ কোথাই ? সংস্কৃতি চর্চার জন্য গড়া ওই ভবন তো যখন যারা শাসন ক্ষমতায় আসে তাদের চেলা চামুণ্ডাদের আখড়া হয়ে ওঠে। আর এখন তো দিনের পর দিন তালা বন্ধ থেকে সাপ খোপ, ইঁদুর ছুঁচো, বাদুর চামচিকের বাসস্থান হয়ে উঠেছে। মানুষ থাকলে কি তার থেকেও খারাপ অবস্থা হবে ?
এবারে আর মেজাজ ধরে রাখতে পারেন না ওসি শুভাশিস বোস। বলেন , এই মাগীই দেখছি নাটের গুরু। লিডারি করা ঘুচিয়ে দিচ্ছি দাঁড়া হারামজাদী।
তারপরই যাত্রাপাড়ার মানুষগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ বাহিনী। লাঠির আঘাতে মাথা ফেটে যায় সোহাগীর। সে দেখে মাথা ফেটে রক্ত ঝড়ছে ভজনকাকা, বৃন্দা , রত্নাদেরও। লাঠির ঘায়ে কারও হাত, কারও বা ভেঙেছে পা। বাবা-মায়ের ওই অবস্থা দেখে বাচ্চাগুলোও তাদের কাছে ছুটে যেতে গিয়ে লাঠিপেটা হয়েছে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সবাই। তবুও পুলিশ সমানে লাঠি চালাছে আর বলছে , বল হারামজাদী বেশ্যা মাগীরা , আর আন্দোলন করবি ? সোহাগীর চোখ দুটি কাকে যেন খোঁজে। দেখে দূরে দাঁড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে সুখময়। পুলিশের লাঠিতে মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে। সেদিকে কোন খেয়াল নেই। তার চোখ জলে ভরে যায় এক অন্যরকম যন্ত্রনায়।

( ক্রমশ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)