ফিমেল – ৩৭

ফিমেল

অর্ঘ্য ঘোষ

( ৩৭ )

ভোটপর্ব চুকতেই ফের শুরু হয়ে যায় ঘর ভাঙার তৎপড়তা। সোহাগীরা একবার হান্নানের কাছে ছোটে , একবার বিধায়ক সাদিকুল ইসলামের কাছে ছোটে। কিন্তু হচ্ছে হবে আর দেখব দেখছি আশ্বাস শোনা ছাড়া কাজের কাজ কিছু হয় না। সোহাগীরা বুঝে যায় তারা ব্যবহৃত হয়েছে। নিজের লড়াইটা নিজেদেরই লড়তে হবে।প্রশাসন ফের ২৪ ঘন্টার মধ্যেই বাড়ি খালি করে দেওয়ার নোটিশ পাঠায়। নাহলে প্রশাসনকে বাড়ি ভাঙতে হলে তার জন্য খরচ ধার্য্য করা হবে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়। চরম দোটানায় পড়ে যাত্রাপাড়ার মানুষগুলো।বৃন্দা বলে , ও দিদি শেষ পর্যন্ত কি হবে ? ঘরও হারাব , আবার টাকাও দিতে হবে না তো!
সোহাগী দেখে মানুষগুলোর চোখে মুখে কেমন যেন বিভাজন রেখা ফুটে উঠেছে। কেমন যেন সংশয়ের ছাপ। সে উপলব্ধি করে, এটাকে আর বাড়তে দিলে হবে না। আরও অনেককে প্রভাবিত করবে। প্রশাসন তো সেটাই চায়। কোন রকমে দাবিদারদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে মনোবল ভেঙে দেওয়াটাই তাদের উদ্দেশ্য। সোহাগী তাই বৃন্দাদের আশস্ত করতে বলে , এটা হচ্ছে প্রশাসনের একটা চাল। বাড়িটা ছাড়া আমাদের আছেটা কি? কি করে বাড়ি ভাঙার টাকা আমাদের কাছে থেকে আদায় করবে শুনি ? বড়োজোর জেলে নিয়ে গিয়ে ঢোকাবে তো! তা একপক্ষে ভালোই হবে। বাড়ি ভাঙার পর তো আর গাছতলাতে থাকতে হবে না। দুবেলা খাবারও জুটবে। কি বলেন ভজনকাকা ?
এই বিপদের মুখেও সোহাগীর রসিকতায় আত্মবিশ্বাস ফেরে যাত্রাপাড়ায়। ভজনকাকা বলেন, মরার আবার খাড়ায় ঘায়ের ভয় কি? যেদিন যা হওয়ার হবে।
মুহুর্তে প্রত্যয়ী হয়ে উঠে সবাই। সবার মুখ থেকে একটাই কথা বেরিয়ে আসে, আমাদের হারাবার আছেটাই বা কি ?
ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ে সোহাগের। এইসময়টা সবাই একসঙ্গে থাকাটা জরুরী। কারণ প্রশাসন কিন্বা শাসকদলের লোকেরা তাদের পরিকল্পনা বানচাল করতে কাউকে একা পেলেই মগজ ধোলাই করার চেষ্টা করবে। সেটাকেই সব থেকে বেশি ভয় পায় সোহাগী। তাদের লড়াইটা তো চূড়ান্ত অসম। যেন দাঁড়িপাল্লার একদিকে চেপে রয়েছে সব থেকে ভারী বাটখারা। অন্যদিকে তাদের ওজন নেহাতই অকিঞ্চিৎকর। হাজার চেষ্টা করেও সমতায় আনা সম্ভব নয়। কিন্তু সোহাগী জানে সবাই একসঙ্গে নাড়ালে উলটো দিকের পাল্লাটাকে কিছুটা হলেও নাড়িয়ে দেওয়া যায়। সেই চেষ্টাই করে সে। ঠিক হয় এখন থেকে থাকা খাওয়া সব একসঙ্গে হবে। একা একা কেউ বাজার কিম্বা শৌচকর্ম পর্যন্ত করতে যাবে না। এইভাবে কয়েকদিনের মধ্য গোটা যাত্রাপাড়া যেন একটি পরিবার হয়ে ওঠে। আর সোহাগী হয়ে ওঠে সেই পরিবারের কর্ত্রী। তার মধ্যেই পুনর্বাসনের দাবি সম্বলিত পোষ্টারে ছেয়ে দেওয়া হয় সর্বত্র। সেই পোষ্টার দেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করে। সোহাগীরা হাত জোড় করে তাদের সবিনয়ে জানায় , আমাদের লড়াইটা আমাদেরই লড়তে দিন। খুব শিক্ষা হয়েছে আমাদের। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় গিয়ে আর আমরা মুখ পোড়াতে চায় না। যদি আমাদের দাবির প্রতি সহমত পোষণ করেন তাহলে কোন রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছাড়াই পাশে থাকুন।
সেই আহ্বানে যাদের বাড়ি ভাঙার আশঙ্কা রয়েছে তারাও আসে। জানিয়ে যায় তারাও সঙ্গে আছে। ঠিক হয় , যাই হোক না কেন বুলডোজ্রার বাড়ি ভাঙতে এলে তারা ভিতরেই বসে থাকবে। যাত্রাপাড়ার মানুষগুলোর মুখে ফুটে ওঠে প্রতিরোধের অভিব্যক্তি। কিন্তু আচমকা যেন পরিস্কার আকাশে ঘনিয়ে আসে কালো মেঘ। বিভাজনের যে আশঙ্কা সে এতদিন সোহাগী করছিল তার ছায়া ঘনিয়ে আসে। যাত্রাপাড়ার মানুষগুলোর মধ্যে নয় , বিভাজন রেখা ফুটে ওঠে তার নিজের বাড়িতে। তার অজান্তেই সুখময়কে পার্টি অফিসে ডেকে পাঠায় হান্নান। সেখানে বসিয়ে ভালো করে মগজ ধোলাই করে ছেড়ে দেয় পার্টির নেতারা। তার নমুনা বাড়ি ফিরেই পায় সোহাগী। যে ছেলে এতদিন তার চোখে চোখ রেখে কথা বলে নি , এদিন সেই ছেলেই বলে কিনা তোমার এত বাড়াবাড়ি করার কি দরকার ?
ছেলের মুখের দিকে চেয়ে সোহাগী বোঝার চেষ্টা করে কথাগুলো তার নিজের , না শেখানো বুলি । এরকম ভাবে তার সঙ্গে তো কোনদিন কথা বলে নি সুখ। তাই জিজ্ঞেস করে , মানে কি বলতে চাইছিস তুই ?
ছেলে বলে , দেখ আমাদের তো আলাদা বাড়ি রয়েছে। যাত্রা অফিস ভাঙা পড়লে আমাদের কি ? আমরা অফিস বাড়িতে সরিয়ে নিয়ে আসব।
—- কিন্তু যাদের সরিয়ে নিয়ে আসার জায়গা নেই তাদের কি হবে ? ছেলের দিকে প্রশ্নটা ছুড়ে দেয় সোহাগ।
—– তা নিয়ে তোমারই বা অত মাথা ব্যাথা কেন ?
—- এ কি বলছিস তুই , একসঙ্গে এতদিন আছি। সবাই একটা পরিবারের মতো হয়ে গিয়েছি। তাছাড়া আমাদের অবস্থাও যদি অন্যদের মতো হতো ?
কথাগুলো বলে ছেলের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সোহাগী।
সুখ বলে , তুমি সরে এলে পার্টি আমাকে একটা লোনের ব্যবস্থা করে দেবে বলেছে। সোহাগী বলে , তাহলে এই ব্যাপার ? এতক্ষণের তোর আপত্তির কারণটা স্পষ্ট হল। — তাছাড়া পার্টিও তোমার ওই মাতব্বরি ভালো চোখে দেখছে না।
ছেলের কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় সোহাগীর। এসব কি বলছে সুখ ? কিছুটা সামলে নিয়ে সে বলে , যে পার্টি এতগুলো বিপন্ন মানুষের সামান্য একটু ভালো করতে পারে না তারা ভালো চোখে দেখল না মন্দ চোখে দেখল তা নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না।
—- আমার চেয়ে তাহলে ওরাই তোমার আপন হলো , ওরাই বড়ো হলো ?
প্রশ্নটা কিছুটা যেন অস্বস্তিতে ফেলে দেয় সোহাগীকে।নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলে , ছোট বড়ো — আপন পরের ব্যাপার নয়। রক্তের সম্পর্কেই যে সবসময় আপন , বা বড় নির্ধারিত হয় এমনও নয়। সময় এবং পরিস্থিতিই তা নির্ধারণ করে দেয়। এই যেমন দেখ , এখন আমার থেকেও তোর কাছেই তো পার্টির লোকেরা বড় হয়ে উঠেছে। কিন্তু ওই লোকগুলোর কথা ভাব। ওরা কিন্তু আমাকেই আপন করে নিয়েছে। তাই তাদের কি করে আমি পর করি বল ?
— তাহলে যা ভালো বোঝ করো , এরপর কিছু হলে আমাকে কিছু বলতে এসো না। ব্যাজার মুখে কথাগুলো বলে ঘরে ঢুকে যায় সুখ।
সেটা দেখে খুব কষ্ট হয় সোহাগীর। ভেবেছিল তার লড়াইয়ে ছেলেকেও পাশে পাবে। কিন্তু মায়ের লড়াইয়ের থেকেও তার কাছে নিজের স্বার্থটাই বড়ো হল। সামান্য একটা লোনের জন্য মাকে দু’কথা শুনিয়ে দিতে তার আজ একটুও বাঁধল না। অথচ সে তার যথাসর্বস্ব তুলে দিয়েছে ছেলে-বৌমায়ের হাতে। তাদের পরিবারে বোধ হয় ফাটল ধরে গেল। এরপর ছেলে -বৌমা তার সঙ্গে ভালো করে কথা বলবে বলে মনে হয় না তার। সে না বলুক , সে সহ্য করে নেবে। ওরা ভালো থাকলেই হল। কেবল নাতিটার কথা ভেবে খুব কষ্ট হয়। তার মধ্যেও টানাপোড়েন শুরু হয়ে যাবে না তো! ঠাকুমায়ের সঙ্গে হঠাৎ করে বাবা -মায়ের শীতল ব্যবহার ওইটুকু শিশুর মনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে না তো ? ওইসব কথা ভাবতে ভাবতে খুব মুসড়ে পড়ে সোহাগী। আঘাতটা যে উলটো দিক থেকে আসবে তা স্বপ্নেও ভাবে নি সে। সব শুনে চিন্তিত হয়ে পড়ে বৃন্দারা। তাদের কথাতে ধরা পড়ে তার ছাপ। বৃন্দারা প্রশ্ন করে , এরপর তাহলে কি করবে দিদি ? একমাত্র ছেলেকে তো আর ফেলে দিতে বলতে পারব না। ভজনকাকাও বলেন , সেটাই তো ঠিক। আমাদের কথা ভেব না। কপালে যা আছে তা হবে। ভজনকাকার কথা শেষ হয় না। সোহাগী চিৎকার করে ওঠে , না– আ—। আমি এর শেষ না দেখে ছাড়ব না।

( ক্রমশ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)