ফিমেল – ৩৫

ফিমেল

অর্ঘ্য ঘোষ

( ৩৫ )

স্নান সেরে ফেরার সময় সোহাগী দু’চোখ সায়নকে খোঁজে। যাবার সময় আর একটি বার যদি দূর থেকে চোখের দেখতে পেত! কিন্তু ধারে পাশে তাকে দেখা যায় না তাকে। ডেরায় ফিরে হয়তো এতক্ষণে হাত পুড়িয়ে পেটের ভাতের যোগাড় করছে সে। ডেরা বলতে শ্মশানঘাটের আশেপাশে তালাই – চট কিম্বা মৃতদেহের ফেলে দেওয়া কাপড় ঝুলিয়ে তৈরি ছোট-ছোট খুপরি। ডেরাগুলো দেখেই মন খারাপ হয়ে যায় তার। ওইসব ডেরারই একটাতে হয়তো সায়নের। শীত – বর্ষায় গঙ্গা তীরবর্তী ওইসব খুপরিতে কি করে কাটায় মানুষগুলো ? সবাই কি সায়নের মতোই ভাগ্য বিড়ম্বিত ? বাড়ি ঘর থাকা স্বত্ত্বেও ভাগ্যের পরিহাসে সবাইকেই কি সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ওইভাবে ডেরা বেঁধে থাকতে হচ্ছে ? মনটা বিষন্ন হয়ে যায় সোহাগীর। সেটা লক্ষ্য করে সুবর্ণা জিজ্ঞেস করে , মা লোকটা কি তোমাদের গ্রামেরই ? পেলে তোমাদের বাড়ির খবর ?
সোহাগী কোন কথা বলতে পারে না। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা। কান্না শ্বাশুড়িমায়ের যে মনটা খারাপ তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না সুবর্ণার। শাশুড়ির মন ভালো করার ওষুধটাও ততদিনে তার জানা হয়ে গিয়েছে। সেই ওষুধই প্রয়োগ করে সে , শুভকে তুলে দেয় শাশুড়িমায়ের কোলে। আর নাতির মুখের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে সোহাগীর মনের মেঘটা কাটতে শুরু করে। নাতিকে আঁকড়েই সব ভুলে থাকার চেষ্টা করে সে। নাতিই হয়ে ওঠে তার ধ্যানজ্ঞান , নাতিই হয়ে ওঠে নয়নের মনি। সুখময় অপেরা নামও বদলে যায়। নাতির নামে দলের শুভময় অপেরা নামকরণ করে সোহাগী । নাতিকে সে যেন সব সময় চোখে হারায়। এখন আর নিজে অভিনয় করতে যায় না। ওইদিকটা ছেলে-বৌমাই সামলায়। সে নাতিকে নিয়ে বাড়িতে থাকে। শুভও তার খুব ন্যাওটা হয়েছে। তার হাতেই নাওয়া খাওয়া, এমন কি তার গলা জড়িয়ে ঘুমানোও চায় তার। গল্প বলে তাকে ঘুম পাড়ায় সোহাগী। আর সেসব করতে গিয়েই সুখময়ের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায় তার। সুখময়কে নিয়েও
তো একা হাতেই সব করতে হয়েছে। কিন্তু ছেলের চেয়ে নাতিকে নিয়েই সে যেন একটু বেশিই খুশী থাকতে দেখা যায় সোহাগীকে। কথায় আছে আসলের চেয়ে নাকি সুদ মিষ্টি। শুভকে নিয়ে সকালে স্কুলে আর বিকালে পার্কে যাওয়া রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে তার। শুভ তাকে দিদি বলে ডাকে। সে বলে ভাই। কি ভাবে যে দিনগুলো কেটে যায় তা বুঝতেই পারে না সোহাগী। মনে মনে মনে ভাবে এত সুখ এই পোড়া কপালে সইবে তো ? তার আশঙ্কায় যেন সত্যি হয়। যাত্রাপাড়ার উপর নেমে আসে বিনা মেঘে বজ্রপাত। তার আঁচ সোহাগীকেও লাগে। আমোদপুর-কাটোয়া ছোটলাইনের ধার বরাবর সব যাত্রাদলের অফিস। সামনে দিয়ে চলে গিয়েছে সিউড়ি — কাটোয়া সড়ক। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে ছোটলাইনকে বড়লাইনে রূপান্তরের কাজ , চলছে সড়ক সম্প্রসারণের কাজও। আর দুই নির্মাণ কাজের মাঝে পড়ে যাত্রাপাড়ার অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে । কারণ রেল এবং সড়ক দফতর সবার কাছে জায়গা ফাঁকা করে অন্যত্র উঠে যাওয়ার নোটিশ পাঠিয়েছে। তারপর থেকেই রাতের ঘুম উবে গিয়েছে যাত্রাপাড়ার। অধিকাংশেরই অফিসের মধ্যেই ঘর গেরস্থালী। সমাজের মুলস্রোত থেকে ছিটকে এসে একদিন সবাই কোনরকমে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই গড়ে নিয়েছিল। ঠাঁই বলতে কাদাছিটে কিম্বা খলপা বেড়ার চালাঘর। সেই ঠাঁই হারা হওয়ার আশংকায় যাত্রাপাড়ার মানুষগুলো যেন একহাত বসে গিয়েছে। কাজের উদ্যোমটাই হারিয়ে ফেলেছে তারা। এখন কোথায় যাবে , খাবেই বা কি সেই দুশ্চিন্তা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে তাদের ? কারণ তাদের তো আর ফেরার কোন ঠিকানা নেই। সোহাগীর অবশ্য বাস করার জন্য কাছেই অন্য একটি বাড়ি রয়েছে। কিন্তু দলের অফিসটা রয়েছে যাত্রাপাড়ায়। তাছাড়া এতগুলো বছর যাদের পাশাপাশি একসঙ্গে রয়েছে তাদের এই বিপদের দিনে নিজেকে কিছুতেই আলাদা ভাবতে পারে না সোহাগী। তাই সেও সবার দুশ্চিন্তার শরিক হয়। সামিল হয় সবার সঙ্গে । সারা বছর সামান্য কারণেই পারস্পরিক খিটিমিটি লেগেই থাকে। কিন্তু বিপদের সময় সবাই যেন রাতারাতি একান্নবর্তী পরিবার হয়ে ওঠে। রত্নাদি, বৃন্দা, মাধুরী, মদনদা, উ ভজনকাকা , সুমনদারা সবাই জড়ো হয় সোহাগীর অফিস ঘরে। সবাই সোহাগীকে ধরে , তুমি বেশ বলিয়ে কইয়ে আছ , তোমার মাথাও কাজ করে ভালো। এই বিপদে তুমিই একটা উপায় বের করো।
চরম অস্বস্তিতে পড়ে যায় সোহাগী। সে বলে , না- না আমি কেন ? ভজনকাকা, মদনদাদের মতো বয়স্করা থাকতে আমি কেন ? আমি বরং তোমাদের পিছনে থাকব। যা বলবে তাই করব। সোহাগের কথা শেষ হতে দেয় না রত্নারা। হই হই করে উঠে তারা। সবাই বলে , আমরা ঠিক করেছি তোমাকেই এই দায়িত্ব নিতে হবে।
অগত্যা ঘাড় পাততে হয় সোহাগীকে। কাজকর্ম সব চুলোয় ওঠে। কি করে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। মাঝে মাঝে কখনও রত্না চা দিয়ে যায় , তো মাধুরী মুড়ি তেলেভাজা যোগায়। চাঁদা তুলে এক হাঁড়িতে শুরু হয়ে যায় রান্নাবান্নাও। আলোচনায় ঠিক হয় , সবাই মিলে আগে বি,ডি,ও’র কাছে গিয়ে তাদের সমস্যার কথা বলে পুনর্বাসন চাইবে। বি , ডি, ও কোন ব্যবস্থা করলে ভালো , না করলে তখন অন্য ব্যবস্থা ভাবতে হবে। সেইমতো পরদিনই সবাই বি,ডি,ও অফিস যায়। বি,ডি,ও’র হাতে তুলে দেয় তাদের লিখিত দাবিপত্র। সেই দাবিপত্র দেখে চশমার ফাঁক দিয়ে কেমন যেন অবজ্ঞার দৃষ্টি ছুড়ে দেন বি,ডি,ও তমালকৃষ্ণ বিশ্বাস। তাচ্ছিল্যের সুরে তিনি বলেন, সরকারি জায়গাতে এতদিন বসেছিলেন , আবার পুনবার্সণের দাবি নিয়ে এসেছেন। আপনাদেরই এতদিন সরকারি জায়গায় বাস করার জন্য ভাড়া দেওয়া উচিত। একটা কথা ভালো করে শুনে রাখুন ওইসব ‘দাবি -টাবি’ নিয়ে উন্নয়নের কাজে কোন রকম ব্যঘাত সৃষ্টি করলে তার ফল কিন্তু ভালো হবে না। কড়া হাতেই আমরা তার মোকাবিলা করব। কথাগুলো শুনেই বি, ডি,ও সাহেবের সামনে এগিয়ে যায় সোহাগী। বি,ডি,ও’র চোখে চোখ রেখে বলে , স্যার উন্নয়ন আমরাও চায়। কিন্তু মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই , পেটের ভাতের নিশ্চয়তার দায়িত্বও তো সরকার অস্বীকার করতে পারে না। আর সরকারটাও ভিন্ন গ্রহের কোন জীব নয়। মানুষই সরকার গড়ে। তাই সরকারের সম্পত্তিতে মানুষেও অধিকার আছে।
সোহাগের এমন দীপ্ত জবাবে চমকে যায় তার সঙ্গে আসা যাত্রাপাড়ার মানুষজন। তারা মনে মনে ভাবে , ঠিক লোকের হাতেই নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। আর সোহাগীর কথা শুনে চমকে যান বি , ডি,ও। অশিক্ষিত কিম্বা অর্ধশিক্ষিত একটা ফিমেলের মুখ থেকে এমন কথা শুনবেন তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন। বি,ডি,ও’র চেয়ারটা বসা তো কম দিন হল না তার ! চুল পাকতে চলল বললেই চলে। সেই হিসাবে মানুষজন কম চাড়ানো হল না তার। কিন্তু মুখের উপরে আজ পর্যন্ত কেউ এমন কথা বলে নি তাকে। কথাগুলোয় যে বেশ ঝাঁঝ এবং যুক্তি আছে তা মনে মনে মানতেও হয় তাকে। কিন্তু তা বুঝতে দিতে চান না তিনি। বরং মুখে প্রশাসন সুলভ গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে তিনি বলেন , ওইসব ডায়লগবাজি যাত্রার আসরে আওড়াবেন। আমার যা বলার বলে দিয়েছি। এখন আপনারা যান।
জবাবে সোহাগী বলে , স্যার আমাদেরও যা বলার ছিল আপনাকে বলেছি। এরপর অন্যরকম কিছু হলে তার দায় কিন্তু আপনিও এড়াতে পারবেন না।
এবারে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না বি,ডি,ও সাহেব। মেজাজ হারিয়ে ফেলেন তিনি। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলেন , আপনারা যাবেন না , আমাকে অন্য ব্যবস্থা দেখতে হবে ?
সেদিন কার্যত গলা ধাক্কা খেয়ে বি,ডি,ও অফিস থেকে ফিরতে হয় সোহাগীদের। একজন সরকারি আধিকারিকের কাছে এতটা দুর্ব্যবহার আশা করে নি কেউ। সবাই ভেবেছিলেন, বি,ডি,ও তাদের সমস্যার কথা শুনে কিছু একটা উপায় ঠিক বাতলে দেবেন। কিন্তু উল্টো কথা শুনে সবাই যেন কিছুটা হতাশ হয়ে পড়ে। সোহাগীকে কিন্তু হতাশা গ্রাস করতে পারে না। বরং কেমন যেন জেদ চেপে যায় তার। রাতে চোখের পাতা এক করতে পারে না সে। এতগুলো মানুষ তাকে বিশ্বাস করেছে, তার উপরে ভরসা রেখেছে, সে কি তার কোন দামই দিতে পারবে না ? সব থেকে বড়ো কথা এতগুলো মানুষ তাদের পেশা ছেড়ে যাবে কোথায় ? তাদের জন্য তো আর কোন দরজা খোলা নেই। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে ভোর হয়ে যায় তা টের পায় না সোহাগ।

( ক্রমশ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)