ফিমেল – ৩২

ফিমেল

অর্ঘ্য ঘোষ

( ৩২ )

ক্রমাগত হাত বদল আর ব্যবহৃত হতে হতে ততদিনে বাস্তবকে ভালোভাবেই চিনে ফেলেছে সোহাগী। তাই আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য শুরু হয় তার একক লড়াই। বেঁচে যে তাকে থাকতেই হবে। কারণ পেটে বাড়ছে আর একটা প্রাণ। প্রতিনিয়ত তার অস্তিত্ব টের পাই সে। কতজন কত পরামর্শ দিয়েছে। কেউ বলেছে , চল আমার চেনা কবিরাজ আছে। সব খালাস করে দেবে। কেমন নিঝঞ্ঝাট হয়ে যাবি। কেউ বা বলেছে, হ্যারে ওর বাবার পরিচয় কি হবে ? সব শুনে চিৎকার করে উঠেছে সোহাগী — না , ও আমার পরিচয়েই বেড়ে উঠবে। আমিই ওর বাবা , আমিই ওর মা।
কথাটা বলে বাবার কথা মনে পড়ে যায় সোহাগীর। বাবাও ওইরকম ভাবেই তাদের দু’বোনের জন্য বলত , ওরাই আমার মেয়ে , ওরাই আমার ছেলে। কতদিন বাবার সঙ্গে দেখা হয় নি ! কেমন আছে কে জানে! শেফালীপিসির ওখান থেকে চলে আসার পর লাভপুরের ঠিকানা কোন ভাবেই জানাতে পারে নি। তার ভাগ্য বিড়ম্বনার কথা শুনে বাবা কষ্ট পাবে ভেবে সে গা করে নি। আজ একের পর এক ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বড় বেশি করে মনে পড়ে তার। আর বার বার চোখ ভিজে যায়। অনাগত সন্তানের কথা ভেবে বুক বাঁধতে হয় তাকে। অনাগত সন্তানই যে তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তার কথা ভেবেই অনলস পরিশ্রম শুরু করে সে। দুর–দুরান্তে বায়না নিয়ে অভিনয় করতে চলে যায়। কিছু করে টাকা জমাতেও থাকে। তার এই অসহায়তার সুযোগে কতজন হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে। সেসব সুকৌশলে এড়িয়ে যায় সোহাগী। ওইসব হাতের ভাষা তার ভালোরকম চেনা হয়ে গিয়েছে। ওইসব হাতই তো মঞ্চে পুরস্কার হিসাবে ১০/২০ টাকার নোট সেপটিপিন দিয়ে ব্লাউজে গেঁথে দেওয়ার অছিলায় অস্যভতা করে। ওইসব হাতই তো মহড়ার সময় অভিনয় বুঝিয়ে দেওয়ার অজুহাতে স্পর্শ সুখ খোঁজে। পেটে সন্তান আসার পর থেকে ওইসব হাতের নাগাল কায়দা করে এড়িয়ে যায় সে। কেমন যেন গা ঘিন ঘিন করে তার। কিন্তু সবক্ষেত্রে পারে কি ? অভিনয়ের সময় অনেকেই অনাব্যশক কারণে শরীরের উপরে হামলে পড়ে। সাজঘরে কুইংগিত দেয়। সহকর্মীরা দেখেও দেখে না। কারণ ওটাই দস্তুর। ওই সুযোগটুকুর জন্যই তো অনেকে যাত্রা মঞ্চস্থ করার ঝক্কি পোহান। সেটুকু তাদের না দিলে যে বায়নাই হবে না। তাই সোহাগীকেও কিছুটা মানিয়ে নিতে হয়। ঘেন্না ধরে গিয়েছে অভিনয় জীবনে। যাত্রাদলের কেমন সব গালভরা নাম। কোথাও শিল্পীসংঘ তো কোথাও শিল্পীবন্দনা। কিন্তু কোথাও এক ফোঁটা শিল্পীর সম্মান জোটে না। ঠায় রোদে খোলা গরুর গাড়িতে পোশাক, লাইট, মাইকের বাক্সের উপর বসে অভিনয় স্থলে পৌঁচ্ছানো , তারপর গবাদি পশুর মতোই গোয়ালচালায় গাদাগাদি করে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গেই একত্রে রাত্রিযাপন। এত অবমাননা অন্য কোন শিল্পে আছে কিনা জানা নেই সোহাগীর। পায়ের তলায় একটু মাটি পেলেই আর অবমাননা আর সইবে না সে। তাই পায়ের তলার মাটি খোঁজা শুরু হয় তার।
আপাতত অবশ্য সেই প্র‍য়াস স্থগিত রয়েছে। মাস খানেক ধরে মঞ্চে নামা বন্ধ রয়েছে তার। প্রসবের দিন আসন্ন। নিধারিত দিনে ভর্তি হয় হাসপাতালে। একা , একে বারে একা। সঙ্গে কেউ নেই। থাকার কথাও নয়। কিন্তু এসময় সবাই আত্মীয় স্বজনদের পাশে দেখতে চায়। পশুদের প্রসবের সময়ও পুরুষটি দাঁড়িয়ে থাকে তার সন্তানের জন্মদাত্রীর পাশে। সে কি তাহলে পশুরও অধম ? প্রশ্নটা মনে জাগতেই ম্লান হাসি ফুটে ওঠে তার মুখে। সেই হাসির আড়ালে লুকানো ব্যথা জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে চোখে। ভর্তির সময় হাসপাতালের কর্মীরা জিজ্ঞাসা করেন — কি নাম আপনার স্বামীর ?
সোহাগী জানায় , ভগবান দাস।
কর্মীরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই সে বলে , কেমন পুরনো ধাঁচের লাগছে তো ? কি করব বলুন ওতে তো আমার কোন হাতে নেই। নামটা তো শ্বশুরশাশুড়ীরা রেখেছিলেন। তারা একটু প্রাচীনপন্থী মানুষ ছিলেন কিনা।
ওই পরিস্থিতিতে নিজের রসিকতায় নিজেই অবাক হয়ে যায় সোহাগী। কিন্তু ওটুকু করতে না পারলে যে জটিলতার সম্ভাবনা ছিল তা সে ভালোই জানে। পরদিন সকালে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। জ্ঞান ফিরতেই জানলা দিয়ে চেনা মুখ খোঁজে সোহাগী। ছেলের কান্নায় সম্বিত ফেরে। কি বোকা সে , কে আছে তার ? তাকে দেখতে আসার মতো কেউ তো নেই। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে চোখের জলে ভিজতেই থাকে সোহাগের অভিমানী বুক। পরদিন ছেলেকে নিয়ে একাই পাড়ায় ফেরে সোহাগী। পাড়া বলতে ছোটলাইনের ধার ঘেঁষা কয়েকটি খড়ের চালের মাটির বাড়ির যাত্রার বুকিং অফিস। ওইসব অফিসেই লাইট, মাইক, পোষাকের সঙ্গে ফিমেলদেরও বায়না নেওয়া হয়। পাড়াটির চলতি নাম যাত্রাপাড়া। সেই বাড়িগুলির মধ্যে একটি সোহাগীর। ছেলে কোলে সেই বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই দুর থেকে উঁকিঝুঁকি শুরু হয়ে যায়। চাবি নিয়ে দরজাটা খুলে দেওয়ার জন্যও এগিয়ে আসে না কেউ। শুধু তার পোষা অভুক্ত কুকুর জুডো পায়ের কাছে এসে লেজ নাড়াতে থাকে।
তারপর থেকে শুরু হয় সোহাগীর ছেলেকে মানুষ করা এবং পায়ের তলায় মাটি খোঁজার লড়াই। ছেলে থেকেই তার সুখের দিন শুরু হবে ভেবে ছেলের নাম রাখে সুখময়। আদর করে সুখ বলে ডাকে। রাতে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে গল্প বলে। যাত্রার ডায়লক শোনায়। কখনও বা নিজের ভাগ্যহত জীবনের কথাও রেখে ঢেকে বলে। বলতে বলতেই চোখ দিয়ে জল গড়ায়। টের পেয়ে ছেলে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে, মা তুমি কেঁদ না। তোমার কান্না দেখে আমারও কান্না পায়।
বলতে বলতেই ফুঁপিয়ে ওঠে সুখ। ছেলেকে কাছে টেনে চুমায় চুমায় ভরিয়ে দেয় সোহাগী। ছেলেও মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে , মা তুমি আর কাঁদবে না বলো। আমি বড়ো হয়ে তোমাকে সুখী করব।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না মা। ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। কান্না সামলে বলে , জানি তো সোনা। সেই আশাতেই তো আমি বেঁচে আছি।
ছেলে আর অভিনয় নিয়েই দিন কাটে সোহগীর। সময় গড়িয়ে চলে। সুখ প্রাইমারীর গন্ডী ছাড়িয়ে হাইস্কুলের চৌকাঠে পা রাখে। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও মাধ্যমিকের বেশি আর এগোতে পারে না সে। ওই পরিবেশে সত্যিই সেটা সম্ভবও নয়। বায়না থাকলে ছেলেকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। রাতের পর রাত মা’কে ওই পরিস্থিতিতে দেখে এমনিতেই কেমন যেন হয়ে যায় সুখ । তার উপরে পাড়ায় অন্য দলের মালিক , ম্যানেজার , বায়না করতে আসা যাত্রাপার্টির লোকেদের মদ খেয়ে হল্লা , খিস্তি খেউর শুনতে শুনতে কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে ওঠে সুখময়। নিত্য নতুন পোষাক, ফুর্তির দিকেই তার বেশি মনোযোগ। সোহাগীও বুঝে যায় এ ছেলের পিছনে পড়াশোনার জন্য খরচ করা মানেই টাকা জলে ফেলা। তাই হাল ছেড়ে দিয়ে ছেলেকে স্থিতু করার কথা ভাবতে থাকে। নিজেরও বয়েস হচ্ছে। আর সে রকম ডাক মেলে না। নায়িকার রোল তো আর কেউ দেয় না। সাইড রোলে পয়সাও কম। তাই বিকল্প কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করে সে। হঠাৎ সেই সুযোগও মিলে যায় একদিন। তার পাশেই রাধাকৃষ্ণ অপেরা। মালিক মারা যাওয়ার পর তার ছেলে সাজ পোশাক সহ সব কিছু বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। সোহাগী তার সর্বস্ব দিয়ে সেগুলি কিনে নেয়। ছেলের নামে তার অপেরার নাম হয় সুখময় অপেরা। ছেলেকে করে দল ম্যানেজার। নিজেও অভিনয় ছেড়ে দিয়ে দল পরিচালনা শুরু করে। নিজের দল করার স্বপ্নটা এভাবে পূরণ হয়ে যাবে ভাবতেও পারে নি সে। তাই দ্বিগুন উদ্যমে দলটাকে গড়তে শুরু করে। তার সুদক্ষ পরিচালনায় ভালো শিল্পী, যন্ত্রী, গায়করা যোগ দেয় তার দলে। অন্যদের পিছনে ফেলে বায়নাও বাড়তে থাকে। তারই মধ্যে একদিন মুর্শিদাবাদ থেকে হাজির হয় সুবর্না দাস নামে সুশ্রী একটি মেয়ে। কথায় কথায় জানা যায় , বাপ মা মরা মেয়েটির তিনকুলে কেউ নেই। জঙ্গীপুরের একটি পঞ্চরস দলে অভিনয় করত। কিন্তু দলের মালিকের কুনজর ছিল তার উপর। তার লালসা থেকে বাঁচতেই সে পালিয়ে এসেছে। সোহাগীর পা জড়িয়ে ধরে মেয়েটি বলে , মাসি আমাকে তোমার দলে একটু জায়গা দাও। কোন টাকা পয়সা চাই না। দুটি খেতে পড়তে দিলেই হবে।
চকিতে নিজের ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ে যায় সোহাগীর। এই লাইনের এটাই দস্তুর। সবাই অসহয়তার সুযোগ নিতে চায়। মেয়েটিকে তুলে ধরে সে। কেমন যেন মায়াবী মুখ বাপ মা মরা মেয়েটার। বুকে টেনে নিয়ে বলে , শোন মেয়ে তোমাকে আমি ঠাঁই দিতে পারি। কিন্তু বসিয়ে বসিয়ে তো খাওয়াতে পারব না বাপু। আমার সেই সামর্থ্যও নেই। তোমায় অভিনয় করেই খেতে হবে। পঞ্চরসের সঙ্গে যাত্রার অভিনয়ের কিছুটা পার্থক্য আছে। তোমাকে তালিম দিয়ে গড়ে পিঠে নেব। কিন্তু কোনদিন ল্যাং মারবে না তো ?
কথা শেষ হওয়ার আগেই মেয়েটি বলে ওঠে, মাসিমা নয় , আজ থেকে তুমি আমার মা হলে। মেয়ে কি মাকে কোনদিন ল্যাং মারতে পারে বলো ?
সেই থেকেই সুবর্নার ঠিকানা হয় সুখময় অপেরা। যাত্রাস্থলে সোহাগীই তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। মেয়ে বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাই মায়ের সামনে মেয়ের সঙ্গে কেউ বেচাল করার সাহস দেখায় না। পাখার আড়ালে মেয়েটিকে যেন আগলে রাখে সোহাগী। মনে মনে ভাবে এমনি ছত্রছায়া দিয়ে যদি তাকেও কেউ আগলে রাখত তাহলে কি জীবনটা তার এরকম হত ? সাজঘরে বসে সেই কথাই ভাবতে থাকে সোহাগী।

( ক্রমশ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)