ফিমেল – ৩১

ফিমেল

অর্ঘ্য ঘোষ

( ৩১)

সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সোহাগীকে সবদিক থেকে রিক্ত – নিস্ব করে দিয়ে যায় অরূপ। বিশ্বাস হারিয়ে তাই দুচোখে অন্ধকার দেখে সোহাগী। সর্বস্ব তুলে দিয়েছে সে অরূপের হাতে। ঘরে কানাকড়িও সম্বল নেই। দু’মাসের ঘর ভাড়া বাকি। কি খাবে , কোথায় যাবে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। চূড়ান্ত অস্থিরতার মধ্য দিন কাটে। মানসিক অবসাদ গ্রাস করতে থাকে তাকে। ওইভাবেই একাকী – অসহায় অবস্থায় কেটে যায় দিনের পর দিন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকতায় ফেরে সোহাগী। সময় যেন এক আশ্চর্য মলম। আস্তে আস্তে সে ভুলিয়ে দেয় সব জ্বালা যন্ত্রণা। অভিনয়ের মাধ্যমেই আবার শুরু হয় তার পথ চলা। অভিনয় করতে করতেই আবার মেকআপ ম্যান সুনীল মন্ডলের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। সুনীল মন্ডল তার চাইতে বয়সে বেশ বড়ো। বলা যায় কাকার বয়সী। কিন্তু সোহাগ তখনএকটা ডুবন্ত মানুষ। খড়কুটো আঁকড়েও বাঁচর আকুলি তাকে ব্যগ্র করে তোলে । তাছাড়া এমনিতেই সমাজ এ লাইনের মেয়েদের খুব সস্তা মনে করে। ধরেই নেয় ফিমেলদের নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা যায়। মাথার উপরে কেউ একটা থাকাটা খুব জরুরী। সিথির সিঁদুরটা একটা রক্ষা কবচের মতো কাজ করে। তাই ফিকে হয়ে আসা সিথিতে আবার সে সুনীলের হাতে সিঁদুর পড়ে । আবার দল গড়ার স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। তার জন্য চুটিয়ে অভিনয় শুরু করে সোহাগ।
নিজেদের দল খোলার পাশাপাশি আজও বড় অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্নটা ভুলতে পারে নি সে। ইচ্ছায় হোক , অনিচ্ছায় হোক যেদিন থেকে মঞ্চে পা রেখেছে সেদিন দল করার স্বপ্ন ছিল না। সেদিন কলকাতার যাত্রাদলে অভিনয় করাই ছিল তার একমাত্র স্বপ্ন। নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে জীবন অতিক্রান্ত হলেও সেদিনের সেই স্বপ্নটা হারিয়ে যায় নি। একদিন আচমকা সেই স্বপ্নের সিঁড়ির দরজাটা খুলে যায়।
সেদিন তাদের যাত্রার আসর ছিল স্বর্ণজোল গ্রামে। একই মঞ্চে প্রথমদিন গ্রামের ছেলেদের যাত্রার পাশাপাশি শেষের দিন ছিল কলকাতার তারাময়ী অপেরার যাত্রা।অন্যান্য জায়গার মতোই আগের দিন গরুরগাড়িতে দুপুরের দিকেই সদলবলে গ্রামে পৌঁচ্ছে যায় সোহাগীরা।
গ্রামে তখন তারাময়ী অপেরার পোষ্টারে পোষ্টারে ছয়লাপ। সেইসব পোষ্টারে নায়িকা রীনাকুমারীর লাস্যময়ী মুখ জ্বল জ্বল করছে। সোহাগী মনে মনে ভাবে , কোনদিন যদি তার মুখটাও পোস্টারে দেখতে পেত তাহলে তার জীবনটা সার্থক হত । কিন্তু সেই সৌভাগ্য কি তার কপালে লেখা আছে ?
ভগবান বোধহয় তার প্রতি একটু সদয় হয়েছিলেন সেদিন। যাত্রা শেষে তারই প্রমাণ মেলে। অভিনয় শেষ করে সাজঘরে ফিরে সবাই তখন মেকআপ তুলতে ব্যস্ত। সোহাগীও নিজের ঘরে মেকআপ তুলছিল। সেই সময় পর্দার ফাঁক দিয়ে সোহাগী মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোককে গ্রীনরুমে ঢুকতে দেখে। ভদ্রলোক হাত জোড় করে বলেন , নমস্কার আমার নাম সন্দীপ ভান্ডারী। আমি তারাময়ী অপেরার মালিক।পরিচয় শুনেই সবাই শশব্যস্ত হয়ে পড়েন। খোদ কলকাতার যাত্রাদলের মালিক এসেছে তাদের গ্রীনরুমে তা যেন কেউ ভাবতেই পারে না। তড়িঘড়ি একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে তাদের দলের মালিক জটাদা গদগদ স্বরে বলেন — বসুন স্যার বসুন। কি সৌভাগ্য আমাদের। আপনার মতো এত বড়ো অপেরার মালিকের পায়ের ধুলো পড়ল আমাদের মতো ক্ষুদ্র একটি দলের গ্রীনরুমে।
ভদ্রলোককে দেখে সোহাগীর কেবলই মনে হচ্ছিল এই লোকটা ইচ্ছা করলেই তার স্বপ্ন সত্যি করে দিতে পারেন। আচ্ছা সত্যি সত্যি তাই যদি হয় ?
ঠিক সেই সময়ই সবাইকে অবাক করে দিয়ে সন্দীপবাবু বলেন , আপনাদের গান শুনলাম। নায়িকার অভিনয় তো বেশ উচ্চমানের। আমি তার সঙ্গেই একটু কথা বলতে এসেছি। তাকে কি একটু ডেকে দেওয়া যাবে ?
কথাটা শুনেই বুকটা দুলে ওঠে সোহাগীর। নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারে না সে। অত বড়ো একটা দলের মালিক এসেছেন তার সঙ্গে দেখা করতে! বিষয়টা অনেকের গাত্রদাহের কারণ হয়ে ওঠে। তাই সকলে তাকে ডাকতেও ভুলে যায়। অগত্যা সোহাগী এগিয়ে গিয়ে নমস্কার করে নিজের পরিচয় দেয়। প্রতিনমস্কার করে সন্দীপবাবু বলেন , তুমিই বলছি। কারণ বয়েসে তুমি আমার থেকে অনেক ছোটই হবে।
—- হ্যা, হ্যা নিশ্চয়।
—- আগাম এসে পড়েছিলাম বলে আগাগোঁড়া তোমাদের অভিনয় দেখলাম। তোমার অভিনয় আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি তোমার কাছে।
আবার বুকটা ধক করে ওঠে সোহাগীর। তাহলে কি সে এতক্ষণ মনে মনে যা ভাবছিল তাই সত্যি হতে চলছে। কথাটা ভাবতেই সোহাগী আবেগে আল্পুত হয়ে পড়ে। সহসা কোন কথা বলতে পারে না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সন্দীপবাবুর মুখের দিকে। সন্দীপবাবু বলেন , আগামী মরসুমে আমাদের নতুন যে পালাটা হবে সেটাতে দুজন নায়িকা প্রয়োজন। একটা রোলে তোমায় মানাবে ভালো। তুমি করবে রোলটা ?
কথাটা শুনে সুনীলের দিকে তাকিয়ে থাকে সোহাগী।
এতদিনের লালিত স্বপ্ন ধরা দিতে এসেছে অথচ সোহাগী কোন কথা বলতে পারে না। আসলে সুনীলকে ফেলে সে দলে যোগ দিতে পারবে না। তাই চুপ করে থাকে। তাকে ওইভাবে সুনীলের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে সন্দীপবাবু বলে , না না দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই। কাল থেকেই যোগ দিতে বলছি না। কয়েকদিনের মধ্যেই এ বছরের মতো দল ঘর ঢুকে যাবে। তারপর রিহের্সাল শুরু হবে। তার আগে যোগ দিলেই হবে । ততদিন এখানে বায়নাপত্র থাকলে তুমি দিব্যি অভিনয় করে যেতে পারবে। বেতনের জন্য ভেব না। আমাদের দল শিল্পীর মর্যাদা দিতে জানে।
এবারে মুখ খোলে সোহাগী। সে বলে , আপনি যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা এতদিন আমার কাছে স্বপ্ন ছিল। সবই ঠিক আছে। কিন্তু আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে।
— বলো কি অনুরোধ ?
— আমার স্বামী এই দলের মেকআপ ম্যান। তাকে ফেলে আমি যেতে পারব না। আপনার দলে তাকেও একটু জায়গা দিতে হবে।
সোহাগীর কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে ওঠে সন্দীপবাবুর। ঘাড় নেড়ে বলেন , না সেটা সম্ভব নয়। প্রথমত আমাদের দলে আলাদা করে কোন মেকআপ ম্যান নেওয়া হয় না। শিল্পীরা নিজে নিজে মেকআপ করে নেন। দ্বিতীয়ত বিভিন্ন রকম সমস্যার জন্য দলে একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রী থাকার নিয়মও নেই।
— তাহলে আমার পক্ষে আপনার দলে যোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ক্ষমা করবেন।নমস্কার জানিয়ে নিজের গ্রীনরুমে ঢুকে যায় সোহাগী। সন্দীপবাবু একটা কার্ড জটাদার হাতে দিয়ে ফের সবাইকে নমস্কার জানিয়ে বলেন , ঠিক আছে আমি ঠিকানা দিয়ে গেলাম। যদি মত হয় যোগাযোগ কোর।
সন্দীপবাবু চলে যেতেই গুঞ্জন ওঠে গ্রীনরুমে। শিল্পীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অধিকাংশই তো এতক্ষণ হিংসায় ফেটে মরছিল। তারা এতজন থাকতে সোহাগীর কাছে সন্দীপবাবুর তাদের দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আসাটা কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিল না। তাই তারা যেন স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বাঁচে। তারই মধ্যে মেনকাদি তো বলেই বসেন — অভিনয় না ছাই! দেখলে না, যখন বলল স্বামীকে নিতে হবে তখন কেমন লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল। অভিনয়ের নাম করে নিয়ে গিয়ে কি করত কে জানে ! নাহলে কলকাতা শহরে সুন্দরীর মেয়ের অভাব আছে নাকি ? কথায় আছে গাড়ি-বাড়ি আর নারী , তাই নিয়ে কলকাতা নগরী।
সেদিন রাতে সুনীল সোহাগীকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলে , আমার জন্য তুমি এত বড়ো সুযোগটা হাতছাড়া করলে ?
—- আমার কাছে তোমার চেয়ে বড়ো কিছু নয় গো। তাছাড়া আমরা যে দল গড়ব তা যে সন্দীপবাবুর দলেকে একদিন ছাপিয়ে যাবে না তা কে বলতে পারে ? তুমি বাপু এবার দল গড়ার ব্যাপারে একটু তৎপর হও দেখি।
— হ্যা গো , এবার দল গড়ার কাজটা শুরু করতে হবে।
স্বামীর কথা শুনে আশ্বস্ত হয় সোহাগী। একটা স্বপ্নপূরণ হতে হতেও অধরাই থেকে গেল , তাই দল গড়ার স্বপ্নে সে বিভোর হয়ে ওঠে। দিন কয়েক ধরে সোহাগীর কলকাতা যাত্রাদলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। বিরূপ মন্তব্যের পাশাপাশি সোহাগীর শুভানুধ্যায়ীরা কেউ কেউ বলে , এ তো নিজের পায়ে কুড়ুল মারা হলো সোহাগীর। পরে পস্তাতে হবে ।
সব কথাই কানে আসে সোহাগীর। সে গা করে না। কিন্তু একদিন শুভানুধ্যায়ীদের আশঙ্কাই সত্যি হয়। বারবার তাগাদা দিয়েও অরূপের মতোই দল গড়ার ব্যাপারে সুনীলও গড়িমসি করতে থাকে। একই রোজনামচা শুরু হয়। মাঝেমধ্যে সুনীলও উধাও হয়ে যায়। দু-তিন দিন পরে ফেরে। কিন্তু কোথায় থাকে , কি করে জানতে চাইলে এড়িয়ে যায়। বেশি চাপাচাপি করলে খিঁচিয়ে ওঠে। একান্তে চোখের জল ফেলে সোহাগী। শেষে একদিন কানাঘুষোয় জানতে পারে সুনীলের বাড়িতে তার স্ত্রী ছেলেমেয়ে রয়েছে। সেই কথা তুলতেই খিস্তির বন্যা বইয়ে দেয় সুনীল , তুই কি ভেবেছিলি মাগী ? তোর মতো সাতঘাটের জল খাওয়া ফিমেলকে আমি ঘরে তুলব ?
— কিন্তু তুমি তো বলেছিলে তোমার কেউ নেই ?
—- বলেছিলাম বেশ করেছিলাম। এখন তো জেনেছিস বাড়িতে আমার স্ত্রী-ছেলেমেয়ে সবাই আছে। এরপর যেটুকু পাচ্ছিস তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারিস তো থাক , নাহলে পথ দেখ।
আর কোন কথা বলতে পারে না সোহাগী। কত কথা মনের মধ্যে ভীড় করে আসে। এই লোকটির জন্যই সে তার অভিনয় জীবনের লালিত স্বপ্নকে গলা টিপে খুন করেছে। তার ভালোই প্রতিদান পেল। মনকে বোঝায় , তাদের মতো মেয়েদের তো পুরোপুরি কিছু পাওয়া ভাগ্যে লেখা নেই। প্রেম ভালোবাসা , ঘরসংসার সবই হাত তোলা। তাই সবকিছু মেনে ও মানিয়ে নিয়েই থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই সুখও বেশিদিন স্থায়ী হয় না। সুনীলও একদিন সবকিছু হাতিয়ে নিয়ে হাওয়া হয়ে যায়। আগের বারের আঘাতে মচকে ছিল , এবারে যেন ভেঙে পড়ে সোহাগী। কারণ ততদিনে তার পেটে এসেছে সুনীলের সন্তান। সুনীলও তা জানে। সব জেনেও অসহায় একটি মেয়েকে এই অবস্থায় কেউ কি ফেলে পালাতে পারে ? ওই পরিস্থিতিতেও নিজের ভাবনায় হাসি পায় সোহাগীর। সে তো আর মানুষ নয় , সে তো শুধুই ফিমেল। মানবিক ব্যবহারও তাই তাদের প্রাপ্য নয়। তবু লজ্জার মাথা খেয়ে পেটের শত্রুটার কথা ভেবে ঠিকানা খুঁজে খুঁজে একদিন সুনীলের বাড়ি পৌঁছোয়। সব শুনে মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠেন সুনীলের স্ত্রী পদ্মাবতী। শ্লেষ মিশ্রিত গলায় বলে , আহা হা হা। মরণ দেখে বাঁচি না। ঘটা করে আবার সিথিয় সিঁদুর পড়েছে দেখ। লজ্জাও লাগে না। ফুর্তি করে পেট বাঁধিয়ে আবার ঢঙ করতে এসেছে।
মরমে মরে যায় সোহাগী। কোনরকমে বলেতে পারে , দিদি তুমিও তো মেয়ে। আমার কথাটা একবার ভাব। আমি কি করব ? ওকে একবারটি ডেকে দাও।
খিঁচিয়ে ওঠে পদ্মাবতী — কি করবি তা আমরা কি জানি ? পেট খসিয়ে আবার কাউকে ধরে নে। নাহলে গলায় কলসি বেঁধে কুঁয়ে নদীতে ডুবে মর। এখানে লোক খিটকেল করবি না বেশ্যা মাগি। নইলে ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব।
সশব্দে মুখের উপর বন্ধ হয়ে যায় দরজা। কানের পর্দা ভেদ করে যেন গরম সিসের মতো ঢুকে যায় কথাগুলো। নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে যায় সোহাগীর। মনে মনে বলে , ঠাকুর প্রতিদিন আসরে নামার আগে তোমার স্মরণ নিই। কিন্তু কেন আমার সঙ্গে বারবার এমন হয় ? কেন যে ডাল ধরি তাই ভেঙে যায় ?

( ক্রমশ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)